“দাদা, আমাকে একটি রঙিন ধুতি দিও তো” মৃত্যুর মাত্র দুইদিন আগে বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর কাছে এমন আবদার করেছিলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। ভাইয়ের সেই আবদার পূরণ করতে বাড়িতে থাকা অতিরিক্ত একটি রঙিন ধুতি পাঠিয়েও দিয়েছিলেন গোপীনাথ। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই ধুতি আর পরা হলো না গণপতির। শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে পাঠানো সেই ধুতিই নিজ হাতে ছোট ভাইয়ের চিতায় তুলে দিতে হয়েছে বড় ভাইকে। এই স্মৃতি মনে পড়লেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন গোপীনাথ।
বুধবার (২৬ আগম্ট) বিকেলে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর শুনশান বাড়িটির গেটে বসে এমনভাবে আহাজারি করেন গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় পুরোহিত। শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বাদী তিনি।
আরো পড়ুন: ‘প্রীয়ম ছিল আমাদের বংশের শেষ পুত্র সন্তান’
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর দাবি, দুই যুবক কীভাবে চারজনকে হত্যা করল, তা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। এর পেছনে আরো কেউ বা বড় কোনো শক্তি জড়িত থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গোপীনাথ চক্রবর্তী জানান, মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি গণপতির এই বাড়িতে এসেছিলেন। সেসময় দুই ভাই ও তার পরিবার মিলে দুই-তিন ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, গল্প গুজব আর আড্ডা দিয়েছেন।
আরো পড়ুন: শেষ রাতে নয়, ভোরের আলোতে ৪ হত্যাকাণ্ড ঘটায় মুগ্ধ-সিদ্ধার্থ: পুলিশ
ভাইয়ের সঙ্গে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া ও করেছিলেন গোপীনাথ। ওই সময় তিনি একটি রঙিন ধুতি পরে গিয়েছিলেন। ধুতিটি দেখে ছোট ভাই গণপতি আবদার করেন ওই রকম একটি ধুতির।
গোপীনাথ বলেন, “আমি বলেছিলাম, বাড়িতে অতিরিক্ত আছে, আগামীকাল পাঠিয়ে দেব।” তিনি বাড়িতে ফিরে তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের বাড়ি থেকে মেয়ের জামাইয়ের কাছে বদরগঞ্জে ধুতিটি পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকে জামাইয়ের রংপুরে এসে ধুতিটি গণপতির কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল।
তিনি বলেন, “মির্জাপুর থেকে রংপুরে পাঠিয়ে দিতে আড়াইশো টাকা খরচ হয়। যেহেতু, আমার স্ত্রী মেয়ের বাড়িতে যাবে এবং জামাই রংপুরে যাতায়াত করে, তাই সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, ছোট ভাইয়ের কাছে যেন পৌঁছে যায়। কিন্তু সেই ধুতি আর গণপতির পরা হয়নি।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে গোপীনাথ বলেন, “ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই ধুতি আর ছোট ভাইয়ের পড়া হলো না। বাড়ি থেকে ধুতিটি যখন এসেছে, তখন ছোট ভাইয়ের চিতায় তুলে দিয়েছি।”
কেঁদে উঠে তিনি বলেন, “এটাই আমার বড় দুঃখ থেকে গেল। বড় ভাই হয়ে ছোট ভাইয়ের আবদার, একটা ধুতি পরিয়ে দিতে পারলাম না। আজীবন আমাকে সেই কষ্ট বয়ে যেতে হবে।”
ছোট ভাইসহ তার পরিবারের চার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোপীনাথ। তার ভাষায়, ‘দুইজন যুবক চারজন লোককে হত্যা করলো, এটা সহজ কথা নয়। এর পেছনে আরো বড় কোনো শক্তি থাকতে পারে। যদি সেটি সঠিক তদন্ত করে বের করা না হয়, তাহলে হয়তো বা সত্যের বিষয়টি অজানাই থেকে যেতে পারে।”
প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি সঠিক তথ্য খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “কীভাবে এবং কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, আপনারা সঠিক তথ্য খুঁজে বের করুন। আমাদের সর্বোচ্চ চাওয়া সঠিক তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। এর সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। সমাজ ও দেশ এই ঘটনা নিয়ে জেগেছে।” এরপরও প্রশাসন সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে আর কিছু করার থাকবে না বলেও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন তিনি।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে গোপিনাথ চক্রবর্তী
ভাই হারানোর শোকের মধ্যেও গোপীনাথের মনে এখন সবচেয়ে বেশি নাড়া দিচ্ছে ছোট ভাইয়ের সেই সামান্য আবদার একটি রঙিন ধুতি। যে ধুতি পরার কথা ছিল গণপতির, শেষ পর্যন্ত সেই ধুতিই উঠেছে তার চিতায়।
ভাইকেসহ একই পরিবারের চারজনকে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো এমন শত্রু আগে থেকেই ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গোপীনাথ বলেন, “আমার ভাই খুবই ভালো সাদাসিধা মানুষ। তার এমন শত্রু থাকতে পারে বলে আমার জানা নেই। তবে বাড়িটি করার সময় কিছু চাঁদা দেওয়া নিয়ে ঝামেলা ছিল পরবর্তীতে সেটি মিটিয়ে গেছে। যে দুই যুবকরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের সাথে আর কেউ আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করছি।”
পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীর ভবনের ছাদে বসে গত ২১ আগস্ট রাতের শেষ অংশে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামের ওই দুই যুবক ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে ছাদে উঠে আসেন গণপতি চক্রবর্তী। মাদক সেবনে বাধা দেওয়া এবং জবাবদিহি করায় ওই দুই যুবক গলায় গামছা পেছিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে গণপতিকে। পরে শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী উপরে আসলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়, এভাবে তার মেয়ে ও ছেলে পিয়মকেও একই কায়দায় হত্যা করে ওই দুই যুবক।








