কোনো এক মনীষী বলেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানুষ আধো ঘুম আধো স্বপ্নের মধ্যে বেঁচে থাকে। কথাটি যে কত বড় সত্য, তা আমরা বহু বছর ধরে দেখে আসছি। ব্রিটিশ আমলে স্বপ্ন দেখেছি, ইংরেজ শাসকেরা চলে গেলেই আমাদের দেশটা উন্নত হবে। অন্তত গণমানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কার্যত একটা দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে এল। কোটি মানুষের শিকড় ওপড়ানো দেশভাগ, আর তার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার মূল্যে এল স্বাধীনতা। অচিরেই পূর্ব বাংলার মানুষ অদূরদর্শী পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কবলে পড়ে গেল। তারা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চাইল, সংস্কৃতিকে সংকুচিত করে রাখল। অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়ন তো ছিলই।
দেশভাগের পর পাকিস্তানের প্রথম দিকের সরকার পূর্ব বাংলার মানুষকে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনোটাই রক্ষা করল না। ক্রমেই এগিয়ে গেল সামরিক শাসনের পথে। দেশভাগের আগে-পরে দাঙ্গার ফলে এবং সম্পদ বদল করে লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারত বা পাকিস্তানে পাড়ি জমায়। পাকিস্তানের তখনকার ক্ষমতাসীন সরকারের দোসররা দেশছাড়া মানুষের সম্পদকে লুণ্ঠন করে চব্বিশ বছরে বেশ ফুলে-ফেঁপে ওঠে। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতাকামী হয়ে ওঠা বাঙালির প্রবল আন্দোলন এবং শেষ পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ফলে সেই শক্তি এই অঞ্চলে কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়। তবে তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। মুক্তিযুদ্ধে তারা পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হলে তারা ভিন্ন কৌশলে নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকার ক্ষমতায় এসে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজ শুরু করল। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কাছে একটা পর্যায়ে হেরে যায়। পাকিস্তানের পথ ধরে এখানেও সামরিক শাসন কায়েম হয়ে গেল। এ দেশের মানুষ আবার বিভিন্ন চেহারার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন করল। ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর আবার দিনবদলের স্বপ্ন দেখেছিল এ দেশের মানুষ। কিন্তু না, আবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। আবার হতাশা। চেহারায় একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে এল বটে, কিন্তু দেশটা কীভাবে যেন বিভক্ত হয়ে গেল। ঠিক কীভাবে যেন বলা হয়তো ঠিক হবে না। আগেই বলেছি, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি নতুন কৌশলে রাজনীতিতে আবির্ভূত হলো। আবার মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য দেশপ্রেমিকেরা কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারল না, তারাও দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। নামে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সরকারের মধ্যে দুর্নীতি এবং আদর্শহীনতা জেঁকে বসল। নির্বাচিত সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন হয়ে দাঁড়াল নিয়তি। বছরের পর বছর জনগণকে তা সহ্য করতে হলো। শেষ দিকে এসে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মানবাধিকার হরণ যে পর্যায়ে উঠল, তাতে এত দিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্রেরও দম বন্ধ হয়ে গেল। ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার হয়ে উঠল নিয়ম। টানা কয়েকটি একতরফা, বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে ভোটের ওপর থেকে আস্থা চলে গেল দেশবাসীর। জনগণ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছিল। কিন্তু দমনপীড়নসহ নানা কারণে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ছিল হৃতবল। এই সময়ে শুরু হলো সরকারি চাকরিতে কোটার আন্দোলন। তরুণদের কোটা আন্দোলন একসময় সরকার মেনে নিলেও আন্দোলনকারীরা তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারল না। আন্দোলন ঠেকাতে ক্ষমতাসীন সরকার ও দলের কর্মীরা নানা ধরনের যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হলো। এই পরিস্থিতিতে কোটা আন্দোলনকারীরা একরকম হঠাৎ করে আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দিয়ে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের ডাক দেয়। সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ জনগণের একাংশ পথে নেমে আসে। কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায় অনেক শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত ও তরুণসমাজের সদস্য। তারা দিনবদলের স্বপ্ন দেখেই কিন্তু মাঠে নেমেছিল। রাজপথে নেমে প্রাণ গেল শত শত মানুষের। আহত হাজার হাজার। পরবর্তীকালে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পেছনে যে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’-এর কথা উঠে আসে, এই হতাহতরা নিশ্চয় সে বিষয়ে জানত না।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতিতে দেশে চরম অরাজক পরিস্থিতি দেখা দেয়। মানুষ চাইছিল এর অবসান ঘটুক। দ্রুত একটি সরকার গঠিত হোক। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সংবিধান মেনে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিল। এ সরকারের একটা বড় অংশ হলো এনজিও-প্রধানদের নিয়ে। বৈষম্যহীন ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের প্রতিনিধি সেখানে যুক্ত হলো। রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নগণ্য সম্পর্ক থাকা এক সরকারের পথচলা শুরু হলো। আধো ঘুম আধা স্বপ্নে থাকা মানুষ এই ব্যবস্থাকে মেনেও নিল। কিন্তু কোনো নতুন গণমুখী রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি হলো না। বিস্ময় ও দুঃখের বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হলো মুক্তিযুদ্ধ, শিল্প-সংস্কৃতি ও শিক্ষা। সরকারের সমর্থকসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে শিক্ষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, বাউল, মাজারের খাদেম–এরা নির্বিচার অপমানিত হতে শুরু করলেন। ঢালাওভাবে সবাইকে দেওয়া হলো ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ইসলামবিরোধী’ তকমা। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রসমাজ ও জনগণের অনেকে বুঝতে পারল না যে এসবের পেছনে আসলে বাংলাদেশ জন্মের সময় যারা ষড়যন্ত্রকারী ছিল, তাদের হাত আছে। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কারও কারও সঙ্গে রয়েছে তাদের যোগসূত্র। সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিদেশি ষড়যন্ত্র। স্বাধীনতার সকল মৌলিক আদর্শের বিপক্ষে যেন কাজ শুরু করল অন্তর্বর্তী সরকার। ফ্যাসিবাদ ঠেকানোর নামে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধান বাতিলের দাবি তোলা হলো। সরকারপ্রধান বলেই ফেললেন, ‘রিসেট বাটনে’ টিপ দিলেই সব মিটে যাবে। মানুষ নানা বিষয় নিয়ে ধীরে ধীরে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল। রিসেট বাটনের কথায় আধো ঘুমে থাকা জনগণ এবার নড়েচড়েই বসল। বিষয়টা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তখন রিসেট বাটনের হোতারা একটুখানি নতুন ভাবনা শুরু করল। শুরু হলো পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নির্বাসন দেওয়ার কথা বলে সংস্কারের তৎপরতা। মোটাদাগে তা দেশের সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনও পেল। সংস্কার তৎপরতার অংশ হিসেবে বিদেশ থেকে উড়ে আসা অধ্যাপক এবং দেশের অভ্যন্তরে কিছু সমমনা ব্যক্তি সর্বত্র নতুন ন্যারেটিভের নামে নিজস্ব ভাবনাচিন্তার অনুপ্রবেশ করারও চেষ্টা করলেন। দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল সংবিধানকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কিছু আপসও করল।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য তাদের নিয়োগকর্তা ছাত্রনেতাদের নিয়ে একের পর এক চেষ্টা করেছে। আবার তারা সংস্কার সেরেই নির্বাচন দেওয়ার কথাও বলে যাচ্ছিল। এ সরকার ১৮ মাস ক্ষমতায় থাকার সময় ছাত্রনেতা ও অন্য সদস্যদের কারও কারও বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। সরকারপ্রধান তাঁর আকাঙ্ক্ষাকে ষোলো আনা বুঝে নিয়েছেন। দেশে দুর্নীতি কমল না। টিআইবির সদ্য প্রকাশিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সরকারের সেবা খাতগুলোতে ঘুষ-দুর্নীতি বেড়েছে।
চব্বিশোত্তর বাংলাদেশে নতুন মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মূলত ব্যর্থ হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দলের স্থান পেয়েছে। সংসদে বসাটাই ছিল তাদের আজীবন স্বপ্নের জায়গা। অন্তর্বর্তী সরকার কতগুলো বিতর্কিত চুক্তি করে নিন্দিত হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের জন্য বিব্রতকর নানা ব্যবস্থা করে গেছে। শিল্প-সংস্কৃতি, শিক্ষা–এসব বিষয়কে এমনভাবে ইউনূস সরকার আঘাত করেছিল যে সেখান থেকে ফিরে আসাও একটা কঠিন কাজ হয়ে গিয়েছে। তারা সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি করে গেছে, তা হলো আইনশৃঙ্খলাকে বল্গাহীন করে দিয়ে মব সংস্কৃতি সৃষ্টি। এখনো মব নানা জায়গায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের আবহমানকালের অসাম্প্রদায়িকতার চর্চাকে তারা আঘাত করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করা। অথচ অতীতের কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের সময়ে রুটিন কাজের বাইরে কোনো ধরনের চুক্তি করেনি। আরেকটি কাজ ছিল ঢালাওভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা।
ইউনূস সরকারের দেড় বছরে এসব কর্মকাণ্ডের ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মানুষ এখনো স্বস্তিতে ঘুমাতে পারছে না। তারা বিনিদ্র চোখে দেখছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়া, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, খুন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন। অতীতের মতোই নানা দুর্নীতি আবার বাসা বাঁধছে। চাঁদাবাজ, দখলবাজদের রং বদলাচ্ছে কেবল। আগের অনেক সমস্যা এবং ইউনূস সরকারের কর্মকাণ্ডের জেরে নতুন সরকার কোথা থেকে শুরু করবে, সেই পথ পেতে বেগ পাচ্ছে।
কাজেই বর্তমানে এ দেশের জনগণ আর ‘আধো ঘুম আধো স্বপ্নের’ জায়গায় নেই, তারা বিনিদ্র থেকেই অনিশ্চয়তার দুঃস্বপ্ন দেখছে। তবে এটাও ঠিক, মানুষ স্বপ্ন না দেখে বাঁচতে পারে না। তাই তাকে সঠিক পথটি খুঁজে বের করতে হবে। সেই স্বপ্নের মধ্যেই আমরা থাকলাম।
লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব








