ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পরাশক্তিগুলোর অনৈতিক প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ভরকেন্দ্র বদলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি উত্তরণে দু-দুটি মহাযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা সম্বল করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি দেশ এবং যুক্তরাজ্য নিজেদের একটি গণতান্ত্রিক বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। প্রধানত খোলা অর্থনীতি ও সামাজিক সংহতি, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও নৈতিক সুরক্ষা, বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক ঐক্যের সমন্বয়ে নিজেদের মতো করে একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউরোপ। সে কারণে প্রায় ৭৪ কোটি জনসংখ্যার এই ভৌগোলিক অঞ্চল নিজেদের অবস্থান সংহত করতে বিশ্বব্যাপী বিশ্বস্ত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কে আগ্রহী হবে এবং তা স্বাভাবিক।
ইউরোপের দেশগুলো বরাবরই বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বস্ত অংশীদারের ভূমিকা পালন করেছে। প্রথম দিকে তা ছিল সহায়তানির্ভর অর্থাৎ উন্নয়ন সহায়তা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানবিক সহযোগিতাকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন একটি দেশকে হাত ধরে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আজ অর্ধশতাব্দী পরে বাংলাদেশ যেমন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, তেমনি সুপ্রাচীন মহাদেশে নিজেদের দাঁড় করিয়েছে মানবাধিকারভিত্তিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর শক্ত ভিত্তির ওপর।
উল্লেখ্য, এ বছরের এপ্রিলে উভয় পক্ষ একটি অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ছিল কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক। এই চুক্তি ২০০১ সালের পুরোনো কাঠামোর পরিবর্তে রাজনৈতিক সংলাপ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, অভিবাসন, জলবায়ু, পরিবহন এবং জনগণের মধ্যে আদান-প্রদানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ হচ্ছে প্রথম দেশ, যার সঙ্গে ইইউ এমন সময়োপযোগী অংশীদারত্ব চুক্তিটি সম্পাদন করে। এর ফলে উন্নয়ন খাতের সঙ্গে নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিতে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় এই চুক্তি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের ইঙ্গিত বহন করে।
বর্তমানে ইউরোপ হচ্ছে বাংলাদেশের সব থেকে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশের রপ্তানির একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের ক্রেতা হচ্ছে ইইউ। ফ্রান্সের প্রথম সারির দৈনিক ‘ল্যু মন্ড’ জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ইউরোপের দিকে আরও বেশি ঝুঁকছে। সুতরাং ইউরোপ শুধু একটি বাজারই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চয়তার ভরসাস্থল।
বাংলাদেশ দিন দিন ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে অনেক কারণে। এগুলোর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে, পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল বাজার। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে চায় ইউরোপ। ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং অস্থিরতা বিনিয়োগকারী দেশগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তা ছাড়া ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যিক প্রবেশপথের মুখেই বাংলাদেশের অবস্থানও ইউরোপিয়ানদের জন্য এ দেশটির বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা গুরুত্ব বহন করে।
ইউরোপের কাছ থেকে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশ কিছু সুবিধা নিতে পারে। সেগুলোর মধ্যে আছে—
একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে, মধ্যপ্রাচ্য অস্থির হলে কিংবা ডলার সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের ঘরে, শিল্পে, কৃষিতে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ভারতও পিছিয়ে নেই, এই দৌড়ে দেশটিতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ ইতিমধ্যে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার পরেও পাকিস্তান সৌরশক্তির কল্যাণে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে। বাংলাদেশে গড়ে ৫ কিলোওয়াট ঘণ্টায় প্রতি বর্গমিটারে প্রতিদিন সৌর বিকিরণ রয়েছে, যা জার্মানির চেয়ে দ্বিগুণ। অথচ জার্মানির বিদ্যুতের ৬০ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ হচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। আমাদের উচিত হবে এই অবারিত সূর্যের আলোকে সম্পদে পরিণত করা। জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া। সে কারণেই নবায়নযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তি উৎপাদনে টেকসই অবকাঠামো তৈরিতে ইউরোপের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের প্রয়োজন।
বিশ্ব আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। কৃষির আধুনিকীকরণ, শিক্ষার গুণগত মান, অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে এআই হতে পারে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। তেমন করেই পোশাকশিল্পে এর ব্যবহার অকল্পনীয় সম্ভাবনার। জনপ্রশাসনকে দক্ষ এবং গণমুখী করতেও এটি এক তুলনাহীন হাতিয়ার। একটি দেশের টিকে থাকা নির্ভর করে তার নিরাপত্তার ওপর। আমরা সাইবার নিরাপত্তায় ইউরোপের সহযোগিতা নিতে পারি। সাইবার নিরাপত্তা সুসংহত করতে পারলে পরাশক্তিগুলোর দাপট থেকে নিজেদের রক্ষা সম্ভব হতে পারে। সেই সঙ্গে গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ প্রাধান্য পেতে পারে।
ইউরোপে জন্মহারে ধস নেমেছে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলছে। সাম্প্রতিক জনসংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য থেকে দেখা যায়, ইইউর দেশগুলোতে ২০২৫ সালে ৬৫ বছর বা তার বেশি মানুষের সংখ্যা ২২ শতাংশের বেশি। তাই ইউরোপে তরুণ ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ বিপৎসংকুল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করে। এরপর কাজের অনুমতি এবং কারিগরি বা বৃত্তিমূলক কোনো কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁদের চরম পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। সে কারণেই উচিত হবে মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ইউরোপে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলা। এ জন্য দেশে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে ইউরোপের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে; যাতে চাহিদানুসারে ইউরোপে জনশক্তি রপ্তানি করা যায়। এতে উভয় পক্ষ লাভবান হবে।
পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইউরোপের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী কার্যক্রম গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে আমাদের জন্য বহুমুখী সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে ইইউ ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একটি নতুন স্তরে উন্নীত করা যেতে পারে। তবে এই সম্পর্ক হতে হবে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করে বহুমাত্রিক এবং প্রকৃত অংশীদারত্বের মাধ্যমে।
লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী








