মাদারীপুর শহরে অবাধে পুকুর ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন। এতে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে পুকুর, ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ। পাশাপাশি আগুন নিভানোর জন্য পানির সংকটেও পড়ছে ফায়ার সার্ভিস।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৮৭৫ সালে সাড়ে ১৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় মাদারীপুর পৌরসভা। ১৯৯১ সালে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায় মাদারীপুর পৌরসভা। পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ৩৪টি মৌজায় পৌনে দুই লাখ মানুষের বসবাস।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুই যুগ আগেও মাদারীপুর পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক পুকুর ও ডোবা ছিল। বর্তমানে তা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। তবে মাদারীপুরে সবচেয়ে বেশি পুকুর ভরাট হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ওই সময় প্রভাবশালীরা ক্ষমতার দাপটে শহরের বিভিন্ন স্থানের পুকুর বালু দিয়ে ভরাট করেছে।

এছাড়া প্রবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় অনেকেই শহরে এসে জমি কিনে বাড়ি বানাচ্ছেন। অনেকেই আবার পুকুর ভরাট করে বেশি দামে জমি বিক্রি করছেন। পরবর্তীতে ওই ভরাট করা জমিতে মার্কেট, দোকানপাট ও বসবাসের জন্য ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে করে শহরের পুকুর-ডোবা বা জলাশয় কমে যাচ্ছে। ফলে পানির উৎস কমে যাওয়ায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে শহরবাসী।
আরও পড়ুন
বহুতল ভবনের ভিড়ে নিরাপত্তাহীন রাজশাহী
সম্প্রতি মাদারীপুর কলেজ রোড এলাকার নিরাময় হাসপাতালের পশ্চিমপাশের বেশ বড় পুকুরটি বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। পরে তা প্লট করে মালিক জমি বিক্রির বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে দিয়েছেন। একইভাবে বটতলা এলাকার কালিবাড়ি মন্দিরের পুকুরটিও ভরাট করা হয়েছে। শহরের মাস্টার কলোনী মসজিদের পাশের পুকুর, চরমুগরিয়ার পুকুরটিও ভরাট করা হয়েছে। সৈয়দারবালী এলাকার একটি বড় পুকুরসহ শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকার একাধিক পুকুর বালু দিয়ে ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও মাদারীপুরের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র পুরানবাজারের ছোট ছোট কয়েকটি পুকুর কয়েক বছর আগেই ভরাট করা হয়। এরপর পুরানবাজারের বড় মসজিদের পুকুরটিই ছিল অগ্নিকাণ্ডের শেষ ভরসা। সেটাও কয়েক বছর আগে ময়লা আবর্জনা ফেলে অর্ধেকের বেশি ভরাট হয়ে গেছে। বাকিটুকু ব্যবহার অযোগ্য। ফলে গত বছর পুরানবাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগলে তা পানির অভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয়। এতে ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ১৯টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

মাদারীপুর শহরের পুরানবাজারের গার্মেন্ট ব্যবসায়ী সোহাগ হাসান বলেন, পুরানবাজার হচ্ছে মাদারীপুর জেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি ঝুঁকির মধ্যে আছে। কারণ এখানে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস যথাসময়ে পৌঁছালেও পানির সরবরাহ কম থাকায় নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাই এখানে মসজিদের পাশে যে পুকুরটি ময়লা আবর্জনায় নষ্ট হয়ে গেছে, তা পুনরায় পরিষ্কার করে আগেই রূপে ফিরিয়ে আনা দরকার। এছাড়াও শহরের অবস্থিত অবশিষ্ট পুকুরগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখা দরকার। তা না হলে এই পুরানবাজারে আগুন লাগলে পানির অভাবে ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা।
মাদারীপুর শহরের শকুনি এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে শহরে অনেক পুকুর দেখা যেতো। এখন বেশিরভাগ পুকুরই ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শহরের কোথাও আগুন লাগলে পানি পাওয়া যায় না। শহরের মধ্যে এখন যতগুলো পুকুর রয়েছে এগুলো যাতে আর ভরাট হতে না পারে সে ব্যাপারে প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে শহরবাসী হুমকির মধ্যে পড়বে।
আরও পড়ুন
৫ ডুবুরির কাঁধে রংপুরের ৮ জেলা
মাদারীপুরের পরিবেশবাদী সংগঠন ফ্রেন্ডস অব নেচারের প্রতিষ্ঠাতা রাজন মাহমুদ বলেন, সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শহরে একের পর এক পুকুর, ডোবা ও জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে। তাছাড়া বর্তমানে শহরে এখন পর্যন্ত যে কয়টি পুকুর অবশিষ্ট আছে, সেগুলোও মাঝেমধ্যে প্রভাবশালীরা ভরাটের উদ্যোগ নেয়।

মাদারীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, মাদারীপুরে ২০২৫ সালে ২৭৭টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৯৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদারীপুর শহরে এখন পানির উৎস কম। সম্প্রতি শহরের পুরান বাজারে আগুন লেগে ১৯টি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পুড়ে গেছে। ওই এলাকায় পানি স্বল্পতা থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে। তাই শহরের পুকুরগুলো বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন। আর পুকুর বা জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন করলে ঝুঁকিও থেকে যায়। তাই প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

মাদারীপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার আবু আহমেদ ফিরোজ ইলিয়াস বলেন, জলাশয় ভরাট করার ক্ষেত্রে পৌরসভার নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। প্রচলিত আইনে যে শাস্তির ব্যবস্থা আছে, সেটিই প্রয়োগ করা হয়। তাছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা হলে, সেক্ষেত্রে পৌরসভার পক্ষ থেকে তেমন কিছু করার থাকে না। তবে কোনো পুকুর বা জলাশয় ব্যক্তিমালিকানায় আছে, অথচ এ পুকুর ব্যাপকভাবে কাজে লাগছে- সেক্ষেত্রে পুকুর ভরাট করতে চাইলে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাছাড়া সরকারিভাবে যে পুকুরগুলো রয়েছে, তা নতুন করে ভরাট করতে চাইলে, সেই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও কেউ নতুন করে পুকুর ভরাট করতে চাইলে, তা যদি আমরা জানতে পারি তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
সিলিন্ডারে ‘মরণফাঁদ’
মাদারীপুর পৌরসভার পৌর প্রশাসক (উপসচিব) মোছা. জেসমিন আকতার বানু বলেন, মাদারীপুর পৌরসভা এলাকায় দিনে দিনে পুকুরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। শহরের জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন আর কাউকে পুকুর বা জলাশয় ভরাট করতে দেওয়া হবে না। শহরে এখন যে পুকুরগুলো আছে, তা সংরক্ষণ করা হবে। তবে যারা পুকুর ভরাট করবে বা চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফএ/এএসএম








