২০০১: আ স্পেস ওডিসি মুভিটি দেখেছেন? এই বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন মুভির প্রাগৈতিহাসিক দৃশ্যটির কথা কি মনে করতে পারছেন? ওই দৃশ্যে দেখানো হয়, এক আদিম মানব প্রথম হাতিয়ার হিসেবে হাতে তুলে নেয় একটি লম্বা হাড়। সেটি দিয়ে সে শিকার করে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে এবং শেষ দৃশ্যে শূন্যে ছুড়ে মারে। আমাদের সাধারণ ধারণাও ঠিক এমনই। আমরা ধরে নিই, আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ারটি ছিল কোনো না কোনো অস্ত্র। ধারালো পাথর বা ভোঁতা লাঠি দিয়ে তারা হয়তো শিকার করত, কাটাকাটি করত।
কিন্তু পাথরের যুগ মানেই যে শুধু পাথরের অস্ত্রের যুগ, তা তো নয়। ওই সময় তো কাঠ বা লতাপাতার মতো উদ্ভিদজাত জিনিসেরও বিস্তর ব্যবহার হতো, যা হয়তো সময়ের অতল গর্ভে পচে গিয়ে হারিয়ে গেছে। এ কারণেই আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখন এক নতুন সম্ভাবনার কথা বলছেন। কেমন হতো, যদি আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ারটি কোনো অস্ত্র না হয়ে শুধু একটা পাত্র হতো?
আদিম যুগে মানুষ কীভাবে আফ্রিকা থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লমার্ক কিসেল এবং তাঁর দল প্রাগৈতিহাসিক পাত্রগুলোর একটি বিশাল ডেটাবেস তৈরি করেছেন। সেখানে লাখ লাখ বছর পুরোনো কয়েক শ পাত্রের নমুনা রয়েছে।
পাত্রের বৈপ্লবিক ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাপালাচিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটির প্যালিয়োঅ্যান্থ্রোপলজিস্ট মার্ক কিসেল মনে করেন, একটি পাত্র আদিম মানুষের জীবনে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করেছিল। মূল্যবান কোনো জিনিস জমিয়ে রাখা বা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বয়ে নিয়ে যাওয়ার এই সুবিধাটাই মানুষকে অন্য প্রাণীদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছিল।
মার্ক কিসেল এবং তাঁর দল প্রাগৈতিহাসিক পাত্রগুলোর একটি বিশাল ডেটাবেস তৈরি করেছেন। সেখানে লাখ লাখ বছর পুরোনো কয়েক শ পাত্রের নমুনা রয়েছে। যদিও কিসেলের মতে, এগুলো সেই আমলে ব্যবহৃত পাত্রের অতি সামান্য একটি অংশ মাত্র।
কিন্তু এখানে পাত্র বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে? এই গবেষণায় কিসেলরা পাত্রের একটি চমৎকার ও বিস্তৃত সংজ্ঞা দিয়েছেন। এমন যেকোনো জিনিস, যার ভেতরে কিছু রাখা যায় এবং যা ভেতরের জিনিসটাকে বাইরের জগৎ থেকে আলাদা করে রাখে, আর যাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মানুষের শরীরে বা অন্য কোনো উপায়ে বহন করা যায়, তা-ই পাত্র।
এই সংজ্ঞার কারণে চামচও কিন্তু একধরনের পাত্র! ফ্রান্সে পাওয়া লাল বেলেপাথরের তৈরি প্রাগৈতিহাসিক প্রদীপ, রাজহাঁসের ডানার হাড় দিয়ে বানানো সুচ রাখার খাপ কিংবা আফ্রিকা অঞ্চলে পানি বহনের কাজে ব্যবহৃত উটপাখির বিশাল ডিম—এগুলো সবই একেকটা পাত্র। কিসেলের দল এমন ৭৩৯টি ভ্রাম্যমাণ পাত্রের খোঁজ পেয়েছেন।
মানুষ ৪ লাখ বছর আগে প্রথম আগুন জ্বালিয়েছিল ইংল্যান্ডে, দাবি বিজ্ঞানীদেরমার্ক কিসেলদের ডেটাবেসের সবচেয়ে পুরোনো পাত্রটি পাওয়া গেছে জাম্বিয়ার কালাম্বো ফলসে। গাছের ছাল দিয়ে তৈরি এই থালাটির বয়স প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ বছর!
আগে ধারণা করা হতো, পাত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে আজ থেকে বড়জোর ১০ হাজার বছর আগে। অর্থাৎ যখন থেকে মানুষ কৃষিকাজ শুরু করল এবং উদ্বৃত্ত ফসল জমিয়ে রাখার দরকার পড়ল, তখন থেকেই পাত্রের উদ্ভব। কিন্তু এই ধারণা এখন পুরোপুরি বাতিল। মার্ক কিসেলদের ডেটাবেসের সবচেয়ে পুরোনো পাত্রটি পাওয়া গেছে জাম্বিয়ার কালাম্বো ফলসে। গাছের ছাল দিয়ে তৈরি এই থালাটির বয়স প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ বছর!
কিসেলের ডেটাবেসের প্রায় ৮৭.৮ শতাংশ পাত্রই পাওয়া গেছে ইউরোপে। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, পাত্রের ব্যবহার ইউরোপেই শুরু হয়েছিল। বরং ইউরোপে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ বেশি হয়েছে বলেই সেখানকার নমুনা বেশি মিলেছে। আসল সত্যটা হলো, আদিম মানুষ হয়তো লাখ লাখ বছর আগে থেকেই পাত্রের ব্যবহার করত। কিন্তু কাঠ বা লতাপাতার মতো পচনশীল বস্তু হওয়ায় সেগুলো আর টিকে থাকেনি। শিম্পাঞ্জি বা অন্য প্রাইমেটরা হয়তো পাতা দিয়ে স্পঞ্জের মতো পানি শুষে খায়, কিন্তু তারা কোনো পাত্র বানাতে পারে না। এখানেই মানুষের সঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
কিসেল বলেছেন, আদিম মানুষের পাত্র ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন উদ্দেশ্যটি হয়তো ছিল নিজেদের শিশুদের বহন করা। শিম্পাঞ্জিদের গায়ে ঘন লোম থাকে, যা আঁকড়ে ধরে তাদের বাচ্চারা সহজেই ঝুলে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের যেহেতু বড় লোম ছিল না, এমন সোজা হয়ে হাটতে হতো, তাই শিশুদের বহন করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল।
৫ হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর প্রথম শহরের হদিস মিলল ইরাকে১৯৭৬ সালে নৃবিজ্ঞানী ন্যান্সি ট্যানার এবং অ্যাড্রিয়েন জিলম্যান প্রথম বলেছিলেন, আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ার হয়তো ছিল কোনো ঝুড়ি, যা দিয়ে নারীরা খাবার সংগ্রহ করতেন।
মানবশিশুরা জন্মের পর এতটাই অসহায় থাকে যে তারা নিজে থেকে কিছু আঁকড়ে ধরতে পারে না। তাই লাখ লাখ বছর আগে অস্ট্রালোপিথেকাসের মতো আদিম মানবেরা হয়তো শিশুদের বহন করার জন্যই প্রথম ঝুড়ির মতো কোনো পাত্র আবিষ্কার করেছিল। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে পরিচিত লুসিও হয়তো ৩৪ লাখ বছর আগে এভাবেই কোনো ঝুড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে!
এই ঝুড়ির ধারণাটি কিন্তু নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে নৃবিজ্ঞানী ন্যান্সি ট্যানার এবং অ্যাড্রিয়েন জিলম্যান প্রথম বলেছিলেন, আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ার হয়তো ছিল কোনো ঝুড়ি, যা দিয়ে নারীরা খাবার সংগ্রহ করতেন। ইতিহাস সব সময়ই শিকার, যুদ্ধ আর সহিংসতার পুরুষতান্ত্রিক চশমা দিয়ে দেখা হয়েছে। বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখিকা উরসুলা কে লে গুইন তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন, আমাদের ইতিহাস শুধু মারামারি আর রক্তপাতের গল্প দিয়ে ভর্তি।
অথচ বেঁচে থাকার জন্য শিকারের চেয়েও বড় প্রয়োজন ছিল খাবার সংগ্রহ করা এবং তা একটি পাত্রে জমিয়ে রাখা। একটি পাত্রে জমানো খাবারই খারাপ আবহাওয়ার দিনগুলোতে আদিম মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
মানবজাতির টিকে থাকার মূল রহস্য আসলে আমাদের আগ্রাসন বা বুদ্ধিমত্তার মধ্যে নয়, বরং আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহমর্মিতার মধ্যে। আর এই সহযোগিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সেই সাধারণ পাত্রটি, যা দিয়ে হয়তো কোনো এক আদিম মানুষ তার নিজের জমানো খাবারটুকু তার বিপদে পড়া কোনো সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল। মানুষের ইতিহাস শুধু অস্ত্রের নয়, একটি সাদামাটা পাত্রেরও হতে পারে!








