শ্রাবণের বিদায় আর ভাদ্রের আগমনের এই সময়ে বাংলাদেশে বর্ষার মেঘের আনাগোনা কিছুটা কমে আসতে শুরু করে। আকাশ মাঝেমধ্যেই হয়ে ওঠে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সন্ধ্যার পর ঢাকা ও বাংলাদেশের আকাশে মহাকাশপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে এক চমৎকার মহাজাগতিক অভিজ্ঞতা। এই দুই সপ্তাহে বিশেষ করে বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পারসেইড উল্কাপাত, সন্ধ্যার পশ্চিম আকাশে শুক্র গ্রহের রাজত্ব এবং চাঁদের মায়াবী রূপান্তরে আকাশে ভিন্ন সাজ দেখা যায়।

সন্ধ্যার আকাশে শুক্র গ্রহের একক রাজত্ব

আগস্টের প্রথমার্ধে সূর্যাস্তের পরপরই পশ্চিম আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হিসেবে দেখা যাবে শুক্র গ্রহকে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই (সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট থেকে ৭টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে) পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিগন্তে শুক্রকে খালি চোখেই একখণ্ড হিরের মতো জ্বলজ্বল করতে দেখা যাবে। জুনের মতো সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের সান্নিধ্য না থাকলেও, আগস্টের এই প্রথমার্ধে শুক্র তার নিজস্ব সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতার কাছাকাছি অবস্থান করবে। ঢাকার আলো–ঝলমলে এবং সামান্য ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আকাশেও এই সন্ধ্যাতারা দেখতে কোনো সমস্যা হবে না। সূর্যাস্তের প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর এটি পশ্চিম দিগন্তে তলিয়ে যাবে।

চাঁদ ও গ্রহের মায়াবী মিলন

আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহে চাঁদ তার ক্ষীয়মাণ ও পূর্ণতার পর্যায় অতিক্রম করার সময় বেশ কিছু চমৎকার দৃশ্য উপহার দেবে। আগস্টের ৩ ও ৪ তারিখের সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে দেখা মিলবে এক অতি সরু নতুন চাঁদের ফালি। ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের পর এই সরু বাঁকা চাঁদ শুক্র গ্রহের খুব কাছাকাছি থাকবে। নীলচে গোধূলির পটভূমিতে বাঁকা চাঁদ আর উজ্জ্বল শুক্রের এই সহাবস্থান খালি চোখে এবং বিশেষ করে ফটোগ্রাফির জন্য এক অনন্য মুহূর্ত তৈরি করবে।

আর বাংলা সালের হিসেবে ২৮ শ্রাবণে ১৩ আগস্ট শ্রাবণের শেষ পূর্ণিমা দেখা যাবে। ১২ ও ১৩ আগস্ট রাতের আকাশে দেখা যাবে এই মাসের পূর্ণ চাঁদ, যা ঐতিহাসিকভাবে স্টারজন মুন নামে পরিচিত। সন্ধ্যার পর পূর্ব-দক্ষিণ দিগন্ত থেকে উদিত হওয়া এই পূর্ণ চাঁদের আলোয় ঢাকা শহরের ছাদ কিংবা গ্রামবাংলার প্রকৃতি রুপালি আলোয় ভেসে যাবে।

বছরের সেরা আকর্ষণ: পারসেইড উল্কাপাত

আগস্ট মাসের প্রথমার্ধের সবচেয়ে বড় মহাজাগতিক উৎসব হলো বিখ্যাত পারসেইড উল্কাপাত। সুইফট-টাটল ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে এই উল্কাপাত ঘটে। এই উল্কাপাত আগস্টের পুরো প্রথমার্ধজুড়েই সক্রিয় থাকবে, তবে এর সর্বোচ্চ চূড়া পিক দেখা যাবে ১২ আগস্ট দিবাগত রাতে এবং ১৩ আগস্ট ভোরে। সাধারণত এই উল্কাপাতে প্রতি ঘণ্টায় ৫০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত অত্যন্ত উজ্জ্বল উল্কা দেখা যায়। ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় পূর্ণিমার চাঁদের উজ্জ্বল আলো থাকায় রাত ১১টা পর্যন্ত কিছুটা কম উল্কা চোখে পড়তে পারে। তবে উত্তর-পূর্ব আকাশে নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে তাকালে চাঁদের আলোর বাধা সত্ত্বেও বেশ কিছু তীব্র আলো সৃষ্টিকারী ফায়ারবল উল্কা খালি চোখেই স্পষ্ট দেখা যাবে।

সন্ধ্যার নক্ষত্রমণ্ডলী ও সামার ট্রায়াঙ্গেল

সন্ধ্যা ৮টার পর ঢাকার আকাশ যদি মেঘমুক্ত থাকে, তবে মাথার ঠিক উপরে তাকালে দেখা মিলবে বিখ্যাত সামার ট্রায়াঙ্গেল। ভেগা, ডেনেব এবং আলটায়ার নামের তিনটি তারা মিলে তৈরি ত্রিভুজটি এখন সন্ধ্যার আকাশে একদম উঁচুতে অবস্থান করছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে লালচে নক্ষত্র অ্যান্টারেসকে ঘিরে বৃশ্চিক রাশি নক্ষত্রপুঞ্জটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠবে।

আগস্টের এই প্রথম ১৫ দিন প্রকৃতির এক অসীম ক্যানভাস থাকবে আমাদের সামনে। ১২ আগস্টের সন্ধ্যায় ছাদের খোলা হাওয়ায় বসে থেকে আকাশের বুকে একেকটি উজ্জ্বল ফায়ারবলের ছুটে যাওয়া দেখার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে।

সূত্র: স্কাইম্যাপ, টাইম অ্যান্ড ডেট, স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ, অ্যাস্ট্রোনমি ডটকম, সাইটেক