২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধকে স্মরণ করে আজ পালিত হচ্ছে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্যান্স ডে। দিবসটি সেই মুহূর্তকে চিহ্নিত করে, যখন চাপ ও ভয় দেখিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা চললেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও দেশের ভবিষ্যতের জন্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন মূলত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বলে বিবেচিত হতো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় বলে ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই সেই ধারণা পাল্টে দেয়। কোটা সংস্কার দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন যখন সহিংসতা, ক্যাম্পাস ভাঙচুর ও চাপের মুখে পড়ে, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।
১৪ জুলাইয়ের বিতর্কিত মন্তব্য ও পরবর্তী দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহের পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৭ জুলাইয়ের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলো খালি করার প্রক্রিয়া শুরু হলে অনেকেই আন্দোলন থমকে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু পরদিনই পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। ১৮ জুলাই ঢাকার রামপুরা, বাড্ডা, নতুন বাজার, কুড়িল, উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, মহাখালী, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে রাস্তায় নামেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা মেরুল বাড্ডা, রামপুরা ও বসুন্ধরা এলাকায় অবস্থান নেন। একই সময়ে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি), নর্থ সাউথ ও আইইউবির শিক্ষার্থীরা কুড়িল বিশ্বরোড ও প্রগতি সরণি এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। এসব প্রতিরোধ সেদিন আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয় বলে আন্দোলন-সংশ্লিষ্টরা বলেন।
শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ কেবল ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নগরবাসী ও সাধারণ মানুষও রাস্তায় নামেন। ফলে আন্দোলন দ্রুত গণআন্দোলনের রূপ নেয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ২৭ জন প্রাণ হারান এবং সহস্রাধিক আহত হন। নিহতদের মধ্যে অন্তত চারজন ছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পরদিনও আন্দোলন অব্যাহত থাকে এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ও কারফিউ জারির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ থেমে যায়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ১৮ জুলাইকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্যান্স ডে হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে। চলতি বছর দেশের কয়েকটি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কারণে দিবসটির মূল রাষ্ট্রীয় আয়োজন ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মাননার আয়োজন থাকবে।
দিবসটি উপলক্ষে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (PUAAB) বলেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শহীদদের সাহস ও আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। সংগঠনটির বক্তব্যে বলা হয়, তাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, বরং ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সাহস স্মরণ করা, আত্মত্যাগের সম্মান জানানো এবং সেই উত্তরাধিকার এগিয়ে নেওয়া এখন নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৮ জুলাই তাই কেবল একটি তারিখ নয়। এটি সেই দিন, যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছিলেন—ঐক্যবদ্ধ প্রজন্মকে সহজে স্তব্ধ করা যায় না। তাঁদের অনেকে যৌবন, স্বপ্ন, এমনকি জীবন দিয়েও আশার দীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। সেই উত্তরাধিকারই আজকের দিবসের মূল বার্তা।








