ডিজিটাল প্রতারণা ও চাঁদাবাজির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে অন্যের নামে নিবন্ধিত মোবাইল সিমকার্ড। ডিস্ট্রিবিউশন হাউজের অসাধু কর্মকর্তা ও আইটি বিশেষজ্ঞদের যোগসাজশে গ্রাহকদের আঙুলের ছাপ চুরি করে একসঙ্গে সচল করা হচ্ছে হাজার হাজার সিম। কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি হওয়া এসব সিম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জঙ্গি তৎপরতা ও মাদক চোরাচালান চালাচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র। সম্প্রতি এমন একটি চক্রের সন্ধান পেয়ে ২২ হাজার সচল সিমসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের যুগ্মকমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ যুগান্তকে বলেন, রাজধানীর লালবাগে ২৭ জুন অভিযান চালিয়ে প্রতারকচক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলো ফরিদপুর জেলার সালথা থানার সিংহপ্রতাপ (উত্তরপাড়া) গ্রামের মাওলানা জিল্লুর রহমানের ছেলে আবু তালহা এবং একই এলাকার সাদেক মাতব্বরের ছেলে শামীম। তারা প্রায় দুই বছর ধরে লালবাগের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অবৈধ কারবার চালিয়ে আসছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে দেদার তোলা হচ্ছে সিম। সাধারণত একটি সিমের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা হলেও এই ধরনের প্রি-অ্যাক্টিভেটেড নিবন্ধিত সিম কালোবাজারে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদি সিমের সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট বা নগদ) অ্যাকাউন্টও সচল করা থাকে, তবে তার দাম ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। গত জানুয়ারিতে বিভিন্ন অপারেটরের ৫১ হাজার ২৫১টি সিম, ৫১টি মোবাইল ফোন, ২১টি ভিওআইপি গেটওয়ে সামগ্রী এবং পাঁচ চীনা নাগরিকসহ প্রতারকচক্রের আট সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।

ডিবি সূত্র জানায়, ২৭ জুন গ্রেফতার হওয়া তালহা ও শামীমের নেতৃত্বাধীন চক্রটি প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিমাসে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত। চক্রের সদস্যরা বেশ কয়েকটি ধাপে কাজ করে। তাদের রয়েছে তিন-চারটি আলাদা গ্রুপ। এক গ্রুপ মেসেজ পাঠায়। অন্য গ্রুপ মেসেজের অর্থের জোগান দেয়। আরেক গ্রুপ প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ গ্রহণ করে। এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংক লেনদেনের পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার হয়। গ্রেফতার হওয়া চক্রের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ১০-১২ জন প্রতারকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। যেহেতু অপরাধীরা মোবাইল অপারেটর কোম্পানি বা কুরিয়ার সার্ভিসের ভেতরের লোকদের সহায়তায় এই কাজ করছে, তাই শতভাগ প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরই চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হবে।

যে প্রক্রিয়ায় সিম সংগ্রহ : পুলিশ জানায়, অবৈধ সিম সংগ্রহের সবচেয়ে বড় উৎস হলো সাধারণ ও অসচেতন মানুষ। গ্রাহক যখন একটি সিমের জন্য আঙুলের ছাপ দেন, তখন অসাধু বিক্রেতারা সার্ভার ডাউন বা আঙুলের ছাপ মেলেনি বলে পুনরায় বা একাধিকবার আঙুলের ছাপ নেন। প্রতিটি সফল ছাপের বিপরীতে অপরাধীচক্র গ্রাহকের অজান্তেই একাধিক সিম সক্রিয় করে নেয়। অসাধু সিম রিটেইলার বা ডিস্ট্রিবিউটররা বেশি মুনাফার লোভে গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং আঙুলের ছাপের ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করে রাখে। পরবর্তী সময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে সেই তথ্য ব্যবহার করে নতুন সিম অপরাধীচক্রের কাছে সরবরাহ করে। অনেক সময় ভুয়া বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে করপোরেট সিম (একসঙ্গে অনেক) তোলা হয়। পরে এসব সিম অপরাধীদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা, প্রবাসীদের নামে থাকা অথবা মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পুনরায় সিম সচল করার ঘটনাও ঘটছে। কিছু বিক্রেতা যখন সাধারণ মানুষের আঙুলের ছাপ নেন, তখন তারা এক বিশেষ ধরনের সিলিকন প্যাড বা ডিভাইসের মাধ্যমে গ্রাহকের অজান্তেই তার আঙুলের ছাপের অবিকল নকল বা ডিজিটাল ইমেজ তৈরি করে নেয়। গ্রাহক চলে যাওয়ার পর সেই ক্লোন করা আঙুলের ছাপ এবং সংরক্ষিত এনআইডি নম্বর ব্যবহার করে একের পর এক সিম সচল করে।

যেভাবে ব্যবহৃত হয় সংগৃহীত সিম : প্রতারকদের সংগ্রহ করা সিমগুলো ব্যবহার করে বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এরপর লটারি জয়, সরকারি অনুদান বা ভুয়া পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পেশাদার অপরাধী ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা ব্যবসায়ী বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনে কল করে মুক্তিপণ বা চাঁদা দাবি করতে এই সিমগুলো ব্যবহার করে। মাদক ব্যবসায়ী এবং চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এসব সিম ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা এবং রাষ্ট্রবিরোধী বা ধর্মীয় উসকানিমূলক গুজব ছড়াতেও এসব সিম ব্যবহার করা হয়।

প্রতারণার নিত্যনতুন কৌশল : প্রতারকরা সাধারণ মানুষকে কল করে বলে, ‘ভাই, ভুল করে আপনার নম্বরে ২০ হাজার টাকা চলে গেছে, দয়া করে টাকাটা পাঠান। একই সঙ্গে তারা একটি ভুয়া মেসেজ (যা দেখতে হুবহু ব্যালেন্স মেসেজের মতো) পাঠায়। অসচেতন মানুষ ব্যালেন্স চেক না করেই নিজের টাকা পাঠিয়ে প্রতারিত হন। নিজেদের মোবাইল ব্যাংকিং সেন্টারের হেড অফিসের লোক বা কাস্টমার কেয়ারের ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে প্রতারকরা কল করে বলে, ‘আপনার অ্যাকাউন্টটি ব্লক হয়ে গেছে বা আপডেট করতে হবে।’ এরপর কৌশলে গ্রাহকের ওটিপি বা গোপন পিন নম্বর কৌশলে জেনে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অ্যাকাউন্টের সব টাকা তুলে নেয়। এছাড়া সরকারি অনুদান, লটারি ও উপবৃত্তির লোভ দেখিয়ে এবং ব্ল্যাকমেইলিং ও ‘হানি ট্র্যাপ’-এর মাধ্যমেও অহরহ প্রতারণা হচ্ছে।