বরগুনার তালতলী থানার ব্যারাকে গত ১৪ জুন আত্মহত্যা করেন মো. ফারুক হোসেন নামের এক পুলিশ কনস্টেবল। মৃত্যুর আগে তিনি একটি চিরকুট লিখে যান। তাতে ছিল বহু না বলা বেদনা ও নীরব মানসিক সংগ্রামের ইঙ্গিত। কী কারণে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বরগুনার আমতলী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম মাসুদ।

এ ছাড়া গত বছরের ৮ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ পিবিআইয়ের কনস্টেবল আমিনুল ইসলাম কর্মস্থলে আত্মহত্যা করেন।

পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২৬ সালের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ফারুক ও আমিনুলের মতো পুলিশের ৬৫ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।

পুলিশ বাহিনীতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের ঘাটতিতেই এতগুলো প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যকে এভাবে হারাতে হয়েছে বলে মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

বছরভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী— ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১১, ২০২২ সালে ৬, ২০২৩ সালে ১৩, ২০২৪ সালে ৩, ২০২৫ সালে ১৪ এবং ২০২৬ সালের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ৮ জন আত্মহত্যা করেন। এই পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই কনস্টেবল ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদমর্যাদার সদস্য। কেবল গত দেড় বছরেই আত্মহত্যা করা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ১৬ জন কনস্টেবল এবং ৪ জন এএসআই। এ ছাড়া একজন এসআই এবং একজন এএসপি রয়েছেন।

নিহতদের পরিবার, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাকরির চাপ, পারিবারিক জটিলতা, আর্থিক সংকট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং মানসিক অবসাদ তাঁদের অনেককে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এবং ময়নাতদন্তের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ সদস্যই পারিবারিক ও চাকরিজীবনের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।

কেউ পারিবারিক কলহে বিপর্যস্ত ছিলেন, কেউ মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ছিলেন, আবার অনেকে বদলি ও পদায়ন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, ছুটি না পাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও তাঁদের হতাশা বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের ইস্যু করা অস্ত্র ব্যবহার করে আত্মহত্যা করেছেন।

গত ১৮ এপ্রিল খুলনা রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল সম্রাট বিশ্বাসের মৃত্যু হয়। খুলনা রেলওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার আহমেদ মাঈনুল হাসান বলেছিলেন, পারিবারিক বিভিন্ন কারণে সম্রাট হতাশায় ভুগছিলেন।

গত বছরের ৭ মে চট্টগ্রামের র‍্যাব-৭ কার্যালয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পলাশ সাহার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি লিখেছিলেন, ‘মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আমিই দায়ী।’ এ ঘটনায় চান্দগাঁও থানার ওসি নুর হোসেন মামুন বলেন, তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে আত্মহত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পারিবারিক সংকটের কারণেই পলাশ আত্মহত্যা করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রভাব পুলিশ সদস্যদের কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনে গভীরভাবে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজন ও সহকর্মীরা।

বহু সদস্যকে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়। অনেককে মফস্বল থেকে ঢাকাসহ বড় শহরে পাঠানো হয়। কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা বাড়তি আর্থিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েন।

রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গাইবান্ধা থেকে আমাকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। পরিবার এখনো গাইবান্ধায়। স্ত্রী-সন্তান সেখানে, বাবা-মা গ্রামে। আমি ঢাকায় ব্যারাকে থাকি। তিন জায়গায় খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। বদলির আবেদন করেছি, কিন্তু হয়নি। মানসিক চাপের মধ্যে আছি।’

গত ২ মে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নারী পুলিশ কনস্টেবল মেহেরুন্নেছা ঊর্মির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবার জানিয়েছে, চাকরি, সংসার এবং আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন। ২০২৫-২০২৬ সালের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে ১৬ জন কনস্টেবল আত্মহত্যা করেন। তাঁদের মধ্যে নারী কনস্টেবল ৫ জন।

একজন পুলিশ সদস্য বলেন, মানসিক চাপ পরিবারের দিক থেকেও আসে। ছোট চাকরি, বেতন কম; কিন্তু পরিবারের চাহিদা বেশি। ফলে একটা চাপ তৈরি হয়। অনেকে সেই চাপ সামলাতে পারেন না। অথচ তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং ব্যবস্থাও নেই।

ওই পুলিশ সদস্যের মতে, পুলিশ বাহিনীতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং চালু করা জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, পৃথিবীতে বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ পেশা রয়েছে; যেগুলোতে মানসিক চাপ বেশি থাকে। পুলিশ সেসব পেশার মধ্যে অন্যতম। তাদের মানসিক চাপ আছে। তবে সবাই কিন্তু নিজেকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেন না। মানুষের চাপ নেওয়ার ক্ষমতা একেকজনের একেক রকম। কেউ অল্পতে ভেঙে পড়েন, কেউ আবার অনেক চাপেও কাজ করতে পারেন। তবে কেবল একটি কারণে কখনো আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে না। অনেকগুলো কারণ পুঞ্জীভূত হওয়ার পর এমন ঘটনা ঘটে। তাই পুলিশে নিয়মিত স্ট্রেস রিলিজের জন্য ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসাসেবার জন্য ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও স্থায়ী কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এ ছাড়া দেশের ৫৯টি জেলায় পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও কোথাও পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক মো. সাইদুর রহমান বলেন, পুলিশ সদস্যরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। এ জন্য তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে অধিক যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। স্থায়ীভাবে সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ সময়ের দাবি।

সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন এবং পরিবার থেকে আলাদা থাকার ফলে অনেক সদস্যের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। এ জন্য পুলিশের হাসপাতালগুলোয় সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ইউনিটের কমান্ডারকে অধীনস্থ সদস্যদের মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখতে হবে। অনেকেই নিজের কষ্ট প্রকাশ করেন না। নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে বসতে হবে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন সদস্যের কাছ থেকে ভালো সেবা পাওয়া সম্ভব নয়।