হিউস্টনের গ্যালারিতে তখন রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। জাপানের গড়া সেই দুর্ভেদ্য নীল দেয়ালে বারবার আছড়ে পড়ছে ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন। ম্যাচের ভাগ্য যখন পেন্ডুলামের মতো দুলছে, ঠিক তখনই যেন সময় থমকে দাঁড়াল।
বল পেয়ে প্রথমে নিজেই শট নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন ব্রুনো গিমারেস। কিন্তু সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সিদ্ধান্ত বদলে গেল। জাপানি রক্ষণভাগ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর বুট থেকে বেরিয়ে এল এক নিখুঁত থ্রু পাস। ডিফেন্স চিরে ছুটে যাওয়া সেই বল খুঁজে নিল গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে। বাকি কাজটা অনায়াসেই সারলেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।
সেই এক মুহূর্ত ব্রাজিলকে শুধু শেষ ষোলোয় তোলেনি, বিশ্বকাপে গিমারেসের অসাধারণ ধারাবাহিকতারও প্রতীক হয়ে উঠেছে। চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে এখন তিনি এককভাবে আসরের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা।
কার্লো আনচেলত্তির কৌশল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, গিমারেস শুধু একজন মিডফিল্ডার নন, ব্রাজিলের মাঝমাঠের হৃৎস্পন্দন। চেনা ৪-৩-৩ ছকে তাঁকে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক ‘বক্স-টু-বক্স’ মিডফিল্ডারের ভূমিকায়। অভিজ্ঞ কাসেমিরোর পাশে থেকে তিনি যেমন রক্ষণের ভার সামলান, তেমনি আক্রমণেরও প্রধান চালিকাশক্তি।
জাপানের বিপক্ষে মাঝমাঠ যখন কার্যত অবরুদ্ধ, তখন আনচেলত্তির নির্দেশনায় গিমারেস আরও নিচে নেমে খেলা গড়ে তোলেন এবং দুই প্রান্তে বল ছড়িয়ে দেন। ফলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও মার্তিনেল্লিদের জন্য তৈরি হয় প্রয়োজনীয় জায়গা। রিয়াল মাদ্রিদে সফল সময়ে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে যে নকশা এঁকেছিলেন আনচেলত্তি, ব্রাজিলেও যেন সেই নীলনকশার আলো হয়ে উঠেছেন আড়ালে থাকা গিমারেস।
রক্ষণ ও আক্রমণ—দুই দায়িত্বই সমান দক্ষতায় সামলানো এই মিডফিল্ডারকে ম্যাচ শেষে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন আনচেলত্তি। তিনি বলেন, ‘ব্রুনো আমাদের দলের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ভীষণ ধারাবাহিক একজন খেলোয়াড়। রক্ষণ ও আক্রমণ—দুই জায়গাতেই তার অসাধারণ উপস্থিতি রয়েছে। গোলটির জন্য সে দুর্দান্ত একটি অ্যাসিস্ট করেছে। আমি তাকে নিয়ে খুবই খুশি; কারণ, ব্রুনোর হৃদয়টা অনেক বড়।’
মাঠের প্রতিটি ঘাস চষে বেড়ানোর এই ক্লান্তিহীন মানসিকতাই তাঁকে আলাদা করেছে। প্রথম পর্বে প্রায় ৩২.২ কিলোমিটার দৌড়ে তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক ফুটবলের গতি ও তীব্রতার সঙ্গে কতটা নিখুঁতভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। একবিংশ শতাব্দীতে ব্রাজিলের হয়ে এক বিশ্বকাপে কাকার পর তিনিই প্রথম, যিনি এত ধারাবাহিকভাবে সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করছেন।
সমালোচকদের উদ্দেশে ম্যাচ শেষে তাঁর দৃপ্ত ঘোষণা ছিল, ‘কারও মনে যদি কোনো সন্দেহ থেকে থাকে, আজ থেকে আর থাকবে না।’ কথাটা যেন শুধু আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং হলুদ জার্সির বিপুল প্রত্যাশাকে জয় করারও এক রাজকীয় ঘোষণা।
অথচ গিমারেসের শুরুটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। মাত্র তিন ও পাঁচ বছর বয়সে মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছিল হাসপাতালের বিছানায়। ফুসফুস সচল রাখতে চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল খেলাধুলা। সাঁতারে মন না বসলেও ফুটবলেই খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের পৃথিবী।
১৬ বছর বয়সে সাও পাওলোর অডাক্স ক্লাবের অনাড়ম্বর একাডেমিতে ইঁদুর আর ছাদ চুইয়ে পড়া পানির মধ্যে ২২ জন তরুণের সঙ্গে লড়াই করে জায়গা করে নিতে হয়েছে তাঁকে। ম্যাচের আগে অতিরিক্ত স্নায়ুচাপে বমি করাও ছিল নিয়মিত ঘটনা। সেই ছেলেই বিশ্বকাপের মঞ্চে চাপকে নিজের সবচেয়ে শক্তিতে পরিণত করেছেন।
জাপানের বাধা পেরিয়ে ব্রাজিলের সামনে এখন আরও কঠিন পথ। তবে গিমারেসের কণ্ঠে নেই কোনো সংশয়, ‘আমাদের সামনে পাঁচটি ফাইনাল ছিল। একটি শেষ হয়েছে, এখন বাকি চারটি।’
ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্ন যতক্ষণ বেঁচে থাকবে, সেই স্বপ্নের ছন্দ হয়তো বেজে উঠবে গিমারেসের পায়ের স্পর্শে।








