ফুটবলপ্রেমী দেশ হিসেবে আর্জেন্টিনার পরিচিতি বিশ্বজুড়ে। আর্জেন্টাইনরা খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। তারা ফুটবল, তাদের খাবার এবং তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। তবে শুধু ফুটবল নয়, দেশটির মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নানা ধরনের লোকবিশ্বাস, কুসংস্কার ও শুভ-অশুভ ধারণার প্রভাব রয়েছে।

এগুলোর অনেকটাই শতাব্দী প্রাচীন লোককাহিনি, আবার কিছু এসেছে ইতালীয় ও স্প্যানিশ অভিবাসীদের সংস্কৃতি থেকে। আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির যুগেও অনেক আর্জেন্টাইন এসব বিশ্বাস মেনে চলেন-কখনো মজা করে, আবার কখনো একেবারে আন্তরিকভাবে।

বিশেষ করে ফুটবল ম্যাচের সময় এই বিশ্বাসগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমর্থক থেকে শুরু করে অনেক খেলোয়াড়ও নিজেদের ‘লাকি রুটিন’ বদলাতে চান না। যদিও এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও এগুলো আর্জেন্টিনার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

jago

জন্মদিন আগে শুভেচ্ছা নয়

বাংলাদেশে আগেভাগেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো স্বাভাবিক হলেও আর্জেন্টিনায় বিষয়টি অনেকেই অশুভ বলে মনে করেন। জন্মদিনের নির্ধারিত দিন শুরু হওয়ার আগে কাউকে ‘ফেলিজ কুমপ্লেয়ানোস’ (শুভ জন্মদিন) বলাকে দুর্ভাগ্য ডেকে আনার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। তাই ঘড়িতে রাত ১২টা না বাজা পর্যন্ত কেউ কাউকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান না।

আরও পড়ুন

আর্জেন্টিনার জার্সির পেছনে ‘১৮৯৩’ লেখার কারণ জানেন?

‘মুফা’ দুর্ভাগ্যের ভয়

আর্জেন্টিনায় ‘মুফা’ শব্দটির অর্থ অমঙ্গল বা দুর্ভাগ্য। কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা পরিস্থিতিকে যদি দুর্ভাগ্যের কারণ বলে মনে করা হয়, তাহলে তাকে ‘মুফা’ বলা হয়। ফুটবলেও এই শব্দটি বেশ পরিচিত। সমর্থকেরা অনেক সময় মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি মাঠে উপস্থিত থাকলে বা বিশেষ কিছু ঘটলে দলের ভাগ্য খারাপ হতে পারে। অবশ্য এসব বিশ্বাসের পেছনে বাস্তব প্রমাণ নেই।

jagonews

লাল চুলকে ঘিরে অদ্ভুত বিশ্বাস

দেশটির অন্যতম আলোচিত কুসংস্কারের একটি হলো লাল চুলের মানুষকে ঘিরে। অনেক আর্জেন্টাইন মনে করেন, সকালে প্রথমেই যদি লাল চুলের কাউকে দেখা যায়, তাহলে দিনটি খারাপ যেতে পারে। যদিও বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এটিকে নিছক লোকবিশ্বাস হিসেবে দেখেন, তবুও এই ধারণা এখনো লোকমুখে প্রচলিত।

jago

ম্যাচের আগে একই রুটিন

ফুটবলের ক্ষেত্রে কুসংস্কারের সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা যায় ম্যাচের দিন। অনেক সমর্থক বিশ্বাস করেন, যে জার্সি পরে দল জিতেছে, পরের ম্যাচেও সেটিই পরতে হবে। কেউ একই সোফায় বসে খেলা দেখেন, কেউ একই রেস্টুরেন্টে যান, আবার কেউ ম্যাচ চলাকালে আসন পরিবর্তন পর্যন্ত করেন না। খেলোয়াড়দের মধ্যেও একই ধরনের ব্যক্তিগত রুটিন দেখা যায়। অনেকেই নির্দিষ্ট ক্রমে বুট পরেন, একই গান শোনেন বা একইভাবে মাঠে প্রবেশ করেন। এগুলোকে মনোবিজ্ঞানীরা আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

jago

সপ্তম ছেলেকে ঘিরে লোককাহিনি

আর্জেন্টিনার গ্রামীণ অঞ্চলে বহুদিন ধরে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। বিশ্বাস করা হয়, কোনো পরিবারের টানা সাতজন সন্তান যদি ছেলে হয়, তাহলে সপ্তম ছেলে পূর্ণিমার রাতে ‘লোবিসোন’ নামে নেকড়ে-মানুষে পরিণত হতে পারে। এই লোককাহিনি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে ২০শ শতকে দেশটির রাষ্ট্রপতিরা সপ্তম পুত্রের ধর্মপিতা হওয়ার একটি ঐতিহ্য চালু করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক কুসংস্কার কমানো এবং ওই শিশুদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দূর করা।

jago

তরমুজের সঙ্গে লাল ওয়াইন নয়

আর্জেন্টিনায় প্রচলিত আরেকটি বিশ্বাস হলো তরমুজ খাওয়ার সময় লাল ওয়াইন পান করলে তা শরীরের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। বৈজ্ঞানিকভাবে এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই। তবুও অনেক পরিবার এখনো এই দুই খাবার একসঙ্গে এড়িয়ে চলেন।

আরও পড়ুন

মেসির দেশের মানুষ দিনে কত লিটার ‘মাতে’ পান করে জানেন?

মাসের ২৯ তারিখে গ্নোক্কি

প্রতি মাসের ২৯ তারিখে গ্নোক্কি খাওয়ার একটি ঐতিহ্য আর্জেন্টিনায় খুবই জনপ্রিয়। অনেকেই খাবারের প্লেটের নিচে কয়েন রাখেন। বিশ্বাস করা হয়, এতে আগামী মাসে আর্থিক সমৃদ্ধি আসে। ইতিহাসবিদদের মতে, ইতালীয় অভিবাসীদের মাধ্যমে এই রীতিটি আর্জেন্টিনায় জনপ্রিয় হয় এবং পরে এটি লোকবিশ্বাসে পরিণত হয়।

jago

এসব কুসংস্কার নাকি সংস্কৃতির অংশ?

আর্জেন্টিনার সব মানুষ এসব বিশ্বাস মেনে চলেন এমন নয়। অনেকেই এগুলোকে নিছক ঐতিহ্য বা পারিবারিক রীতি হিসেবে দেখেন। তবে ফুটবল, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বিশেষ দিনগুলোতে এই বিশ্বাসগুলো এখনোও দেশটির সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও এসব কুসংস্কার আর্জেন্টিনার সংস্কৃতিকে দিয়েছে এক ভিন্ন পরিচয়, যা দেশটির ফুটবল উন্মাদনার মতোই বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের বিষয়।

সূত্র: সোল স্যালুট, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ব্রিটানিকা

আরও পড়ুন

ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ডের ধারণা এলো যেভাবে

কেএসকে