ডা. মো: আরমান হোসেন রনি

বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। বাড়ির ছাদে উড়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা, গায়ে প্রিয় দলের জার্সি, আর চায়ের আড্ডায় জমে ওঠে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। দুই দলেরই অসংখ্য সমর্থক থাকলেও বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা যেন একটু বেশিই চোখে পড়ে। তবে জানেন কি, ‘আর্জেন্টিনা’ নামটি শুধু ফুটবলেই নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও একটি পরিচিত শব্দ। মানুষের চোখের একটি বিরল জটিলতার নামেও ‘আর্জেন্টিনা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

আমাদের চোখের ভেতরে একটি স্বচ্ছ অংশ থাকে, যাকে লেন্স বলা হয়। এই লেন্সের কাজ হলো আলোকে রেটিনায় সঠিকভাবে পৌঁছে দিয়ে পরিষ্কার দেখতে সাহায্য করা। কিন্তু নানা কারণে এই স্বচ্ছ লেন্স ধীরে ধীরে ঘোলাটে বা অস্বচ্ছ হয়ে গেলে তাকে ছানি (ক্যাটারাক্ট) বলা হয়।

ছানি হলে দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে কমে আসে এবং চিকিৎসা না করালে একসময় অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে।পূর্ণবয়স্কদের অন্ধত্বের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী এই ছানি। অথচ এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য অন্ধত্বের অন্যতম কারণ।

পরিপক্বতার ভিত্তিতে ছানি সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে-

১. ইমম্যাচিউর বা হালকা ছানি - সাধারণত ধূসর রঙের হয়।
২. ম্যাচিউর বা পাকা ছানি - মুক্তার মতো সাদা দেখায়।
৩. হাইপার ম্যাচিউর বা অতিপাকা ছানি -দুধের মতো সাদা রং ধারণ করে।

বিভিন্ন কারণে ছানি হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো বয়সজনিত ছানি। এছাড়া চোখে আঘাত, চোখের প্রদাহ, বিভিন্ন ধরনের রেডিয়েশন, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য মেটাবলিক রোগ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহার কিংবা জন্মগত কারণেও ছানি দেখা দিতে পারে।

ছানি যে কোনো কারণেই হোক না কেন, এর একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো অপারেশন। ওষুধ বা চশমা দিয়ে ছানি সারানো সম্ভব নয়। অপারেশনের মাধ্যমে চোখের ভেতরের অসচ্ছ লেন্স অপসারণ করে সেখানে কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়।

ছানি অপারেশনের সময় একটি বিশেষ জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার নাম ‌‘আর্জেন্টিনা ফ্ল্যাগ সাইন’ বা ‘আর্জেন্টিনার পতাকা চিহ্ন’ । সাধারণত অতিপাকা বা স্ফীতিশীল ছানির ক্ষেত্রে এই জটিলতা বেশি দেখা যায়।

আরও পড়ুন

চা-কফি ছাড়াও সারাদিন সতেজ থাকার সহজ উপায়

কোনো কারণে পাকা ছানিযুক্ত লেন্সের ভেতরে চাপ বেড়ে গেলে তাকে বলা হয় স্ফীতিশীল ছানি। এই অবস্থায় অপারেশনের সময় লেন্সের আবরণ বা ক্যাপসুল কাটতে গিয়ে তা অনেক সময় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছিঁড়ে যায়।

অপারেশনের আগে ক্যাপসুলকে দৃশ্যমান করার জন্য ‘ট্রাইপেন ব্লু’ নামক নীল রঞ্জক ব্যবহার করা হয়। ছিঁড়ে যাওয়া সাদা লেন্সের মাঝখানে নীল রঙের দুই পাশ মিলে তখন দেখতে অনেকটা আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার মতো লাগে। সেখান থেকেই এসেছে ‘আর্জেন্টিনা ফ্ল্যাগ সাইন’ নামটি।

আরও পড়ুন

থুথু দিয়ে টাকা গোনার অভ্যাস বাড়াচ্ছে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জন রোগীর মধ্যে প্রায় ৩ থেকে ২৮ জনের ক্ষেত্রে এই জটিলতা দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, তামাক ব্যবহার, অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড গ্রহণ, পূর্ববর্তী রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগ এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

তাই ছানি অতিরিক্ত পেকে যাওয়ার আগেই অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে অপারেশন করানো অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই পারে দৃষ্টিশক্তিকে নিরাপদ রাখতে।

লেখক: কনসালটেন্ট (চক্ষু), দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল,সোবাহানবাগ , ঢাকা

এসএকেওয়াই