ছবির উৎস, Getty Images

১৯৯৮ সালে নরওয়ে যখন শেষবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল, তখন আর্লিং হালান্ডের জন্মও হয়নি।

তবে ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের নেতৃত্বে নর্ডিক দলটি পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে তার জোড়া গোলে বিদায় করে দিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

বাস্তবে, ১.৯৪ মিটার (৬ ফুট ৫ ইঞ্চি) উচ্চতার এই 'অ্যান্ড্রয়েড' সাতটি গোল করে চ্যাম্পিয়নশিপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার লড়াইয়ে আছেন, যে তালিকায় তার সঙ্গে আছেন আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি এবং ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপে।

কয়েকদিন আগে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর হাসতে হাসতে হালান্ড বলেছিলেন, "আমি জানি না, আমার মনে হয় গোল করাই আমার বিশেষত্ব।"

প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নরওয়ে ইতিমধ্যেই ইতিহাস গড়েছে, তবে শনিবার ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারলে তারা আরও বড় অর্জন নিজেদের ঝুলিতে ভরতে পারবে।

আর নরওয়েজীয়দের আশা আবারও হালান্ডের ওপরই নির্ভর করছে, যাকে নিয়ে এমন পাঁচটি বিষয় আজ আমরা জানাবো, যা হয়তো আপনার অজানা।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

ছবির উৎস, Getty Images

২০০০ সালে ইংল্যান্ডের লিডস শহরে জন্ম হালান্ডের। সেখানে তার বাবা, নরওয়েজিয়ান আলফ-ইঙ্গে হালান্ড লিডস ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে খেলতেন; যিনি ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খেলা জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড় ছিলেন।

End of সর্বাধিক পঠিত

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কিন্তু হালান্ডের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন পরিবারটি দক্ষিণ নরওয়ের ব্রায়ান শহরে নিজেদের আদি নিবাসে ফিরে আসে, যেখানে তরুণ হালান্ড ফুটবল (এবং লাফানো ও সাইক্লিংয়ের মতো অন্যান্য খেলাধুলা) খেলতে শুরু করেন।

কোচ আলফ ইঙ্গে বার্ন্টসেন 'গোল' (Goal) ওয়েবসাইটকে বলেন, "আমি আর্লিংকে প্রথম দেখি যখন তার বয়স পাঁচ বছর, সে তখন এক বছর বেশি বয়সীদের একটি দলের সাথে ইনডোর অনুশীলনে যোগ দিয়েছিল।"

"তার প্রথম দুটি স্পর্শেই গোল হয়েছিল। সে শুরু থেকেই খুব, খুব ভালো খেলতো, যদিও সে আগে কখনো ক্লাবের হয়ে খেলেনি।"

"বয়সে এক বছরের ছোট হওয়ার কারণে সে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের চেয়ে কিছুটা খাটো ছিল। তবে প্রতিপক্ষ তুলনামূলকভাবে লম্বা হলেও, সে গোল করে যেত। তার বয়স যখন ১১ বা ১২, তখনই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে সে অনেক দূর যাবে। আমরা তখনই জানতাম যে যুব আন্তর্জাতিক স্তরে খেলার মতো সব যোগ্যতাই তার আছে।"

১৫ বছর বয়সেই তিনি মাঝারি সারির ক্লাব ব্রায়ান এফকে-র হয়ে খেলা শুরু করেন, যে ক্লাবটি তাদের ইতিহাসে দেশের দ্বিতীয় এবং প্রথম বিভাগের মধ্যে ওঠানামা করেছে। তবে তার দুর্দান্ত গোল করার ক্ষমতার কারণে তিনি নরওয়ের আরেকটি ক্লাব মোল্ডে এফকে-তে চুক্তিবদ্ধ হন, যেটির ব্যবস্থাপনায় ছিলেন কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ওলে গানার সোলশার। সোলশারকে হালান্ডের অন্যতম পরামর্শদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অস্ট্রিয়ান ক্লাব রেড বুল সালজবার্গে থাকাকালীন সময়েই এই স্ট্রাইকার আন্তর্জাতিক মহলের নজর কাড়তে শুরু করেন এবং এরপর জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে নিজের জায়গা পোক্ত করেন।

বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার সিটির তারকা খেলোয়াড়।

End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images

এবারের বিশ্বকাপে হালান্ড কেবল একটি জাতির ভারই বহন করছেন না, বরং সেই সব প্রাক্তন খেলোয়াড়দের সম্মিলিত প্রত্যাশার ভারও বহন করছেন, যারা বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি।

১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ সালে টানা দুটি টুর্নামেন্টে পৌঁছানো ছাড়া, নরওয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলো থেকে ছিটকে ছিল। বড় কোনো টুর্নামেন্টে তাদের সর্বশেষ অংশগ্রহণ ছিল ২০০০ সালের ইউরো কাপে।

তবে এখন তাদের নিজস্ব একজন তারকা রয়েছে, যাঁর খ্যাতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার নরওয়ের হয়ে তার শেষ ১৪টি আনুষ্ঠানিক ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল করেছেন, এই সময়ে তার মোট গোল সংখ্যা ২৭।

সব মিলিয়ে তিনি ৫৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৬২টি গোল করেছেন, যেখানে তার গড়ে প্রতি ৭১ মিনিটে একটি গোল করার রেকর্ড রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

মাঠের বাইরে, হালান্ড সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তার নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসসহ ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন।

এই তরুণ স্ট্রাইকার প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ক্যালরি গ্রহণ করেন। তার খাদ্যতালিকায় গরুর হৃৎপিণ্ড ও কলিজা থেকে শুরু করে কাঁচা মধু এবং দুধের মতো কিছু অস্বাভাবিক প্রোটিনের উৎসও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নিজের একটি ভিডিওতে এই তরুণ খেলোয়াড় বলেছেন, "নিজেকে নিজের সেরা সম্ভাব্য রূপে গড়ে তোলার জন্য যা যা করা দরকার, আমি তার সবকিছুই করি।"

তার অভ্যাসের ব্যাপারে তিনি খুব কড়া, যার মধ্যে রাতে সমস্ত ডিভাইস বন্ধ করে দেওয়া এবং কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর বিষয়টিও রয়েছে।

তবে এটি কোনো নতুন বিষয় নয়। প্রকৃতপক্ষে, অস্ট্রিয়ার রেড বুল সালজবার্গে থাকাকালীন সময় থেকেই, এত অল্প বয়সে তাঁর নিখুঁত ব্যক্তিগত যত্ন দেখে সতীর্থরা তাঁকে অবাক হয়ে দেখতেন।

তার সাবেক সতীর্থ ম্যাক্সিমিলিয়ান ওবার ডিএজেডএন (DAZN)-কে বলেন, "সে একজন শীর্ষ-মানের পেশাদার। ভ্রমণের সময় আমরা যখন তাস খেলি, তখন সে সবসময় কীভাবে নিজের ঘুম বা খাদ্যাভ্যাস উন্নত করা যায়, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ পড়তে ব্যস্ত থাকে। সে সবসময়ই খুব ছোট ছোট খুঁটিনাটি বিষয়গুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, যেগুলো ঠিক করে সে নিজেকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে।"

ছবির উৎস, Getty Images

লিডসে জন্ম নেওয়ার কারণে হালান্ড সহজেই ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন এবং ইউরোপ ও বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে জায়গা করে নিতে পারতেন, কিন্তু এটি কখনোই তার বিকল্প হিসেবে ছিল না।

নরওয়েজীয় ক্রীড়া সাংবাদিক আন্দ্রেয়াস করসুন্ড বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, "বিশ্বব্যাপী সুপারস্টার হওয়া সত্ত্বেও হালান্ড ঠিক আগের মতোই আছেন।"

"তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে তিনি কোথা থেকে এসেছেন এবং প্রায়শই রোগাল্যান্ডে তার ছোট্ট নিজের শহরে বেড়াতে যান। নিজের শেকড় নিয়ে তিনি ভীষণ গর্বিত এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সময় নরওয়েজীয় সংবাদমাধ্যমের জন্য সবসময় সহজলভ্য থাকেন।"

তিনি নরওয়ের ভাইকিং ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে প্রচণ্ড গর্ববোধ করেন।

শেকড়ের প্রতি সেই টান থেকেই তিনি জাতীয় দলের জার্সির পেছনে তার পুরো পদবি, ব্রাউট হালান্ড যুক্ত করেছেন।

ব্রাউট হলো তার মায়ের বিয়ের আগের পদবি, এবং বাবার পদবির সাথে এটিকে যুক্ত করা নরওয়ের একটি ঐতিহ্য।

করসুন্ড বলেন, "নরওয়ের জন্য হালান্ডের মানে সবকিছু। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় একজন নজিরবিহীন সুপারস্টারে পরিণত হয়েছেন। মাত্র ৫৫ লক্ষেরও সামান্য বেশি জনসংখ্যার একটি দেশ থেকে এই গ্রহের অন্যতম সেরা ফুটবলার তৈরি হওয়াটা সত্যিই অসাধারণ একটি ব্যাপার।"

ছবির উৎস, Getty Images

১.৯৫ মিটারের বিশাল উচ্চতা এবং লম্বা সোনালী চুলের কারণে হালান্ড ফুটবলের অন্যতম পরিচিত খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন।

ম্যানচেস্টার সিটিতে থাকার সময় থেকেই তার ক্যারিশমা দ্যুতি ছড়াতে শুরু করে এবং তার রসবোধ, যা অনেক সময় খুব ইংরেজ ঘরানার মনে হয়, ভক্তদের ভালোবাসা অর্জন করেছে।

তার ইউটিউব চ্যানেল, যেখানে তিনি "হালান্ডের জীবনের একটি দিন" ধরনের ভিডিও পোস্ট করেন, সেখানে তার ১.৬ মিলিয়ন বা ১৬ লাখ সাবস্ক্রাইবার রয়েছে।

তিনি 'ভাইকুইনস' নামের একটি অ্যানিমেটেড সিনেমাতেও কাজ করবেন, যেখানে তিনি স্বাভাবিকভাবেই হালান্ড নামের এক ভাইকিং চরিত্রে কণ্ঠ দেবেন।

নরওয়েজীয় সাংবাদিক লার্স সিভার্টসেন বলেন, "আমার মনে হয় আর্লিং কোনো না কোনোভাবে ঠিক প্রথাগত নরওয়েজীয়দের মতো নন। সে আত্মবিশ্বাসী এবং কিছুটা দুঃসাহসীও হতে পারে। সে নিজের মূল্য বোঝে, নিজের মান সম্পর্কে সচেতন এবং নিজের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস রয়েছে।"

"স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় এমন এক সংস্কৃতি রয়েছে যেখানে বিনয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, আর আর্লিং হয়তো বেঞ্চে বসিয়ে রাখলেও অভিযোগ করতো। তাই আমার মনে হয়, নরওয়েজীয়দের জন্য সে একটু আলাদা ধরনের মানুষ... আর এটাই তাকে আমাদের জন্য একজন আকর্ষণীয় নায়কে পরিণত করেছে।"

তার খ্যাতির সাথে সাথে একজন সুপারস্টার হওয়ার প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোও যুক্ত হয়েছে- শার্ট বিক্রি, বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি এবং তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা।

সিভার্টসেন বলেন, "আমরা সাধারণত আমাদের খেলার নায়কদের যেভাবে দেখে অভ্যস্থ, সে এখন তার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন এক ক্যাটাগরির তারকাখ্যাতির অধিকারী।"

"তবে আমি মনে করি, আপনি যদি পুরো দেশের দিকে তাকান, তবে দেখবেন এক অসাধারণ গর্বের অনুভূতি কাজ করছে যে, এমন একজন খেলোয়াড়, যে কি না এতটা সফল, সে আমাদেরই দেশের মানুষ।"

বিবিসি স্পোর্টের জেস অ্যান্ডারসন এবং অদ্বৈত রাজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি।

ছবির কপিরাইট

© 2026 বিবিসি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য বিবিসি দায়বদ্ধ নয়। বাইরের লিংক সম্পর্কে বিবিসির দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধে পড়ুন।