মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, মায়ামি থেকে কানসাস সিটি—গত তিন সপ্তাহ ধরে কলম্বিয়ার বিশ্বকাপ যাত্রা ক্রমশ উত্তর দিকে এগিয়ে চলেছে। এবার হাজার হাজার কলম্বিয়ান সমর্থক ভ্যাঙ্কুভারে জড়ো হচ্ছেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে নেস্টর লোরেঞ্জোর দল। লক্ষ্য ১২ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর কলম্বিয়ার এই ‘হলুদ জ্বর’ এখন কাঁপাতে যাচ্ছে কানাডাকে।

সমর্থকদের এমন গণজোয়ার এবং উৎসবমুখর আবহ শেষবার দেখা গিয়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। দীর্ঘ এক প্রজন্ম পর সেবার কলম্বিয়া বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করায় ব্রাজিলে ঢল নেমেছিল সমর্থকদের। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই তারকা হামেস রদ্রিগেস এবার দলের অধিনায়ক। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রে কিছু বিশৃঙ্খলা হওয়ায় এবার উত্তর আমেরিকায় আসার আগেই সমর্থকদের সতর্ক করেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপের আড়ালে নোংরা রাজনীতি! যে কালো সত্য গোপন রাখতে চায় ফিফা

রদ্রিগেস বলেন, আমরা মাঠে সব সময় আমাদের সেরাটা দেই। সমর্থকদের এই ইতিবাচক শক্তি আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আমি শুধু তাদের এই ভালো পরিবেশ বজায় রাখার অনুরোধ করব।

সমর্থকদের ভালোবাসায় আপ্লুত ফুটবলাররা

চলতি বিশ্বকাপে হামেস রদ্রিগেস এখনো নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাননি। ঘানার বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে হাফ-টাইমেই তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠের বাইরে কলম্বিয়ানদের উন্মাদনা তুঙ্গে।

কানসাস সিটিতে কলম্বিয়ার প্রবাসী জনসংখ্যা খুব বেশি নয়। অথচ ম্যাচের আগের রাতে সমর্থকরা দলের হোটেলের ব্যালকনির নিচে এসে গান গেয়ে খেলোয়াড়দের অভিবাদন জানান। সমর্থকদের এমন ভালোবাসা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফুটবলাররা। দলের প্রধান তারকা লুইস দিয়াস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আপনাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। আপনারা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

কলম্বিয়ার ম্যাচ দেখতে আসা ৫৪ বছর বয়সী হুয়ান কার্লোস মিলা জানান, তিনি এবারই প্রথম বিশ্বকাপে এসেছেন। সঙ্গে এনেছেন স্ত্রী, সন্তান ও তাদের সঙ্গীদের। মেক্সিকো সিটিতে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ দেখলেও গুয়াদালাহারায় পরের ম্যাচের টিকিট পাননি। তবে হাল ছাড়েননি তারা। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে একটি মিনিভ্যান ভাড়া করে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। এরই মধ্যে তারা প্রায় সাত হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

ফুটবলে এটাই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ, কারণ কী?

গাড়ির ভাড়া, পেট্রোল আর হোটেলের খরচ তুলতে মিলার উদ্যোক্তা সন্তানেরা স্টেডিয়ামের বাইরে কলম্বিয়ার জার্সি ও ঐতিহ্যবাহী টুপি বিক্রি করছেন। স্টেডিয়ামে নজর কাড়তে তারা ছয় মিটার লম্বা একটি বিশেষ পতাকাও তৈরি করেছেন।

কলম্বিয়ার ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’

কলম্বিয়ান সমর্থকদের এই বাঁধভাঙ্গা জোয়ার প্রতিপক্ষ দলগুলোকে অবাক করেছে। পর্তুগাল ম্যাচের আগে তাদের কোচ রবার্তো মার্তিনেস বলেছিলেন, মায়ামিতে এতো বেশি কলম্বিয়ান সমর্থক যে আমাদের মনে হচ্ছে আমরা প্রতিপক্ষের মাঠে খেলছি। এই পরিবেশে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজও কলম্বিয়ার সমর্থকদের প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। কুইরোজ একসময় কলম্বিয়ার কোচ ছিলেন। ঘানা বিদায় নেওয়ার পর তিনি বলেন, কলম্বিয়ার আবেগ ও সমর্থক অবিশ্বাস্য। কানসাস সিটির স্টেডিয়ামে ৬০ হাজার হলুদ জার্সির গর্জন আমার অনভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর চাপ তৈরি করেছিল। কলম্বিয়ার এই ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’ তাদের জয়ের কাজটা সহজ করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত?

বিশ্বকাপে এই ফুটবল দলই এখন কলম্বিয়ানদের ঐক্যের প্রতীক। ভ্যাঙ্কুভার স্টেডিয়ামে মঙ্গলবারের ম্যাচেও গ্যালারিজুড়ে হলুদ সমুদ্র দেখার অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব। সমর্থক মিলার কথায়, ফুটবলাররা মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে উন্মুখ হয়ে রয়েছেন। আর আমরা দূর থেকে বুকভরা আশা নিয়ে তাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/