ভারতে প্রতিবছর যৌতুকের কারণে হাজারও নারীর জীবনহানি ঘটছে। অথচ এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে সমাজে আগের মতো গণ-অসন্তোষ বা তোলপাড় দেখা যাচ্ছে না। নতুন এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, যৌতুক নিয়ে বিরোধের জেরে নারীদের হত্যা বা আত্মহত্যায় বাধ্য করার ঘটনাগুলো রাজনৈতিক আলোচনা থেকেও হারিয়ে গেছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
বাড়ছে অপরাধ, কমছে ক্ষোভ
সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে ভারতে যৌতুকজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৪১। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫১৬ জনে। অর্থাৎ, গত কয়েক দশকে অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
আরও পড়ুন
যৌতুক না পেয়ে কেরোসিন ঢেলে স্বামীর আগুন, দগ্ধ তরুণীর মৃত্যু
গত বছরের আগস্টে দিল্লির কাছে গ্রেটার নয়ডায় যৌতুকের দাবিতে ২৮ বছর বয়সী নিক্কি ভাটি নামের এক গৃহবধূকে তার ছয় বছরের সন্তানের সামনেই পুড়িয়ে হত্যা করেন স্বামী। এই নির্মম ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাময়িক ক্ষোভ তৈরি হয়। দিল্লিতে ছোটখাটো কিছু প্রতিবাদ হলেও দ্রুতই সেই আন্দোলন গতি হারিয়ে ফেলে।
নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদ ও স্বনিয়ন্ত্রণ
কিংস কলেজ লন্ডনের সামাজিক নৃবিজ্ঞানী ড. কৃতি কপিলা এই গবেষণাপত্রের লেখক। তিনি জানান, বিশ্বজুড়েই এখন রাজনৈতিক প্রতিবাদের পথ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। ভারতের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় যে কোনো ধরনের বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
গবেষক কপিলা বলেন, ভিন্নমত বা অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ এখন সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজেই নিজেকে সেন্সর করছে। ফলে যৌতুক হত্যাকাণ্ডের মতো সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধেও মানুষ রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছে।
আরও পড়ুন
যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীর চুল কেটে নির্যাতন, স্বামীর দাবি পরকীয়া
যৌতুকের রূপান্তর ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা
ভারতে ১৯৬১ সাল থেকেই যৌতুক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বরপক্ষের যৌতুকের দাবি ও চাপ এখনো ব্যাপকভাবে বজায় রয়েছে। কনেপক্ষ দাবি মেটাতে ব্যর্থ হলে নারীদের নির্যাতন, হয়রানি এমনকি হত্যার শিকার হতে হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়, অতীতে যৌতুক ছিল বরপক্ষকে দেওয়া এক ধরনের উপহার। কিন্তু আইন করে এটি নিষিদ্ধ করার পর এর রূপ বদলে গেছে। এখন বরের জাত, শ্রেণি, শিক্ষা ও পেশাগত মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে ছেলে সন্তানকে একটি লাভজনক মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।
রান্নাঘরের দুর্ঘটনা থেকে আত্মহত্যার পথ
গত শতকের সত্তরের ও আশির দশকে যৌতুকবিরোধী আন্দোলন ভারতের অন্যতম বড় নারী আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তখন ক্ষুব্ধ নারীরা দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলনের গতি কমে গেছে।
আরও পড়ুন
যৌতুকের নির্যাতন সইতে না পেরে গৃহবধূর আত্মহত্যা, স্বামী গ্রেফতার
আশির দশকে নববধূদের মূলত রান্নাঘরে কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হতো এবং একে ‘দুর্ঘটনা’ বলে চালানো হতো। নব্বইয়ের দশকে বাসাবাড়িতে কেরোসিনের ব্যবহার কমে যাওয়ায় এই অজুহাত আর টিকছিল না। এরপর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কৌশলে মেয়েদের আত্মহত্যা করতে বাধ্য করতে শুরু করে।
পারিবারিক লজ্জা ও সামাজিক নীরবতা
হত্যাকাণ্ড যখন আত্মহত্যায় রূপ নিল, তখন জনসাধারণের ক্ষোভ ব্যক্তিগত লজ্জা ও দুঃখে পরিণত হলো। ড. কপিলা বলেন, যারা নিজেই নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে, তাদের পক্ষে প্রচারণা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এটি গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে পারছে না।
এর আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে জনমিতিতে। যৌতুকের দেনা এড়াতে ভারতে কন্যাসন্তান গর্ভপাত করার প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। ফলে দেশটিতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। পারিবারিক গণ্ডির ভেতরের এই সহিংসতা সামাজিক সংহতিকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/








