• দিন গড়ে ৮-১০টি ভুয়া বিল-ভাউচারে সই করেছেন তত্ত্বাবধায়ক
  • এসব বিল-ভাউচারে বসানো হতো ইচ্ছেমতো পণ্য ও দাম
  • হাসপাতাল পরিদর্শনে মন্ত্রী না এলেও করা হয়েছে আপ্যায়ন বিল

লালমনিরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে। বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু আল হাজ্জাজ এবং হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আনন্দ কুমার সাহার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। বদলির আদেশ অমান্য করে জোরপূর্বক পদে বহাল থেকে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে বিদায়ী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

বেশকিছু ভুয়া বিল-ভাউচার জাগো নিউজের হাতে এসেছে। অভিযুক্ত দুই কর্মচারীও জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

আরও পড়ুন

‘ঢামেকের এত সুন্দর পরিবেশ আগে কখনো দেখিনি’

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলির আদেশ অনুযায়ী গত ২০ মে কর্মস্থল ছাড়ার কথা ছিল তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু আল হাজ্জাজের। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, তিনি অবৈধভাবে আরও ২০ দিন দায়িত্বে থেকে নিজের ইচ্ছামতো হাসপাতালের কোষাগারের টাকা লুটপাট করেন। প্রতিদিন গড়ে ৮-১০টি করে ভুয়া বিল-ভাউচারে সই করেছেন তিনি। ক্রয়-সরবরাহ, সেবা বাবদ ব্যয়, ট্রাক ভাড়া এবং নাশতা খরচের নামে এসব ভুয়া বিল তৈরি করা হয়। এমনকি মন্ত্রী হাসপাতালে না এলেও তার আপ্যায়নের নামে এক লাখ টাকার বেশি বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল/ অর্থ আত্মসাতে তত্ত্বাবধায়ক-কর্মচারীর 'দোস্তি'ভুয়া বিল-ভাউচার/ছবি-জাগো নিউজ

সবশেষ গত ৯ জুন বিকেলে হাসপাতাল ছাড়ার আগ পর্যন্ত তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন বিলে সই করে দিনাজপুরে রওয়ানা দেন। ততক্ষণে সরকারি কোষাগার থেকে বেরিয়ে যায় বিপুল পরিমাণ অর্থ।

‘আমাকে অফিসের কিছু কাজ করে দিতে বলা হয়েছিল। তাই আমি এসব করেছি। তারা নির্দেশ দিতেন আর আমি মূল্য এবং পণ্যগুলোর নাম লিখতাম। আমি আসলে জানতাম না যে, এগুলো লিখলে কী ধরনের ঝামেলা হবে। আমাকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, আমি করেছি’—রেকর্ড কিপার

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে জানা যায়, এই টাকা উত্তোলনের জন্য ভুয়া বিল-ভাউচার ম্যানেজ করে দিতেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আনন্দ কুমার সাহা। তিনি বিভিন্ন দোকান থেকে ফাঁকা ভাউচার সংগ্রহ করে নিজের ইচ্ছেমতো পণ্য ও দাম বসিয়ে দিতেন। এরপর বিদায়ী তত্ত্বাবধায়কের সইয়ের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে তা ভাগাভাগি করে নেওয়া হতো।

লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল/ অর্থ আত্মসাতে তত্ত্বাবধায়ক-কর্মচারীর 'দোস্তি'ভুয়া বিল-ভাউচার/ছবি-জাগো নিউজ

শুধু তাই নয়, হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গিয়ে কমিশন বা ‘পিসি’ খাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে আনন্দের বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন

কুষ্টিয়া হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন পা গায়েব

শহরের বিডিআর গেট এলাকায় আনন্দ কুমারের প্রতিবেশী চন্দন কুমার সাহার ‌‘চমক স্টিল ফার্নিচার’ নামের একটি দোকান থেকে অন্তত ৩৯ হাজার ৪০০ টাকার মালামাল কেনার ভুয়া বিল দেখানো হয়েছে। অথচ ওই ভাউচারে উল্লেখ করা অটবি ফার্নিচারের ফাইল বোর্ড, থাই গ্লাস ইত্যাদি পণ্য ওই দোকানে বিক্রিই হয় না। সেখানে মূলত খাট, আলমারি বিক্রি করা হয়। এমনকি ওই দোকানদার হাসপাতালে গিয়ে মেরামত কাজ করেছেন বলেও ভুয়া বিলে উল্লেখ করা হয়েছে।

“‘চমক স্টিল ফার্নিচার’ নামের একটি দোকান থেকে অন্তত ৩৯ হাজার ৪০০ টাকার মালামাল কেনার ভুয়া বিল দেখানো হয়েছে। অথচ ওই ভাউচারে উল্লেখ করা অটবি ফার্নিচারের ফাইল বোর্ড, থাই গ্লাস ইত্যাদি পণ্য ওই দোকানে বিক্রিই হয় না। সেখানে মূলত খাট, আলমারি বিক্রি করা হয়। এমনকি ওই দোকানদার হাসপাতালে গিয়ে মেরামত কাজ করেছেন বলেও ভুয়া বিলে উল্লেখ করা হয়েছে”

দোকানের মালিক তপন কুমার সাহা এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আনন্দ আমার এলাকার ছোট ভাই। সে হাসপাতালে চাকরি করে। একদিন এসে বললো, তার ভাউচার প্রয়োজন। তাই আমি খোলা মনে তাকে একটি পুরোনো ভাউচার বই দিয়েছিলাম। সেই ভাউচার দিয়ে সে যে এই অপকর্ম চালাবে, তা আমার জানা ছিল না। ভাউচারে যেসব পণ্যের কথা এবং যে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, এমন কোনো লেনদেন আমার দোকানে হয়নি। এসব মালামাল আমার দোকানে নেই। সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’

লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল/ অর্থ আত্মসাতে তত্ত্বাবধায়ক-কর্মচারীর 'দোস্তি'হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়/ছবি-জাগো নিউজ

অডিট ফাঁকি দিতে কারচুপি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অডিট টিমের চোখ ফাঁকি দিতে এসব ভুয়া ভাউচার শুধু আনন্দ কুমার একাই লিখতেন না, হাসপাতালের আরও বেশ কয়েকজন কর্মচারী মিলে এগুলো লিখতেন, যাতে হাতের লেখা ভিন্ন হয়। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন রেকর্ড কিপার হোমেরা বেগম।

হোমেরা বেগম নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে বলেন, ‘আমাকে অফিসের কিছু কাজ করে দিতে বলা হয়েছিল। তাই আমি এসব করেছি। তারা নির্দেশ দিতেন আর আমি মূল্য এবং পণ্যগুলোর নাম লিখতাম। আমি আসলে জানতাম না যে, এগুলো লিখলে কী ধরনের ঝামেলা হবে। আমাকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, আমি করেছি।’

‘টাকা উত্তোলনের জন্য ভুয়া বিল-ভাউচার ম্যানেজ করে দিতেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আনন্দ কুমার সাহা। তিনি বিভিন্ন দোকান থেকে ফাঁকা ভাউচার সংগ্রহ করে নিজের ইচ্ছেমতো পণ্য ও দাম বসিয়ে দিতেন। এরপর বিদায়ী তত্ত্বাবধায়কের সইয়ের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে তা ভাগাভাগি করে নেওয়া হতো’

অভিযুক্ত আনন্দ কুমার সাহা এতদিন বিষয়টি গোপন রাখলেও অনুসন্ধান ও প্রমাণের মুখে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হন। জাগো নিউজকে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রথমে দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করেন। পরে তিনি চুপ হয়ে যান। আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও কিছু বলতে চাননি।

লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল/ অর্থ আত্মসাতে তত্ত্বাবধায়ক-কর্মচারীর 'দোস্তি'হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়/ছবি-জাগো নিউজ

অভিযুক্ত হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু আল হাজ্জাজ গত ৯ জুন দিনাজপুরে বদলি হয়ে চলে যান। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন

যে কারণে হাসপাতালকে কারাগারে রূপান্তর করছে শ্রীলঙ্কা

হাসপাতালটির প্রধান অফিস সহায়ক রিয়াজুল সরকার বাবু বলেন, ‘আমি তত্ত্বাবধায়ককে বলেছিলাম, এরকম অর্ডার দেখেছি। তিনি আমাকে অস্বীকার করে বলেছেন, এসব আমি জানি না। তিনি (তত্ত্বাবধায়ক) যেহেতু থেকে গেছেন, অফিসের নির্দেশে এসব কাজ করতে বলেছেন, আমি করেছি। পরে যখন ৯ তারিখে জোরালোভাবে বলেছি, আপনার বদলি হয়েছে; তাকে আর সই করতে দেইনি। পরে ওইদিনই তিনি দিনাজপুরে চলে যান।’

গত ১০ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. আরশাদ হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি নতুন জয়েন করেছি। তবে আগের তত্ত্বাবধায়কের সময়ে বিল-ভাউচার নিয়ে আর্থিক অনিয়মের কথা এবং অভিযোগগুলো শুনছি। এসব অভিযোগ শোনার পর আমি অফিসের মাধ্যমে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। পুরো বিষয়টি অবগত হওয়ার পর বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

এসআর/এএসএম