কেবল একটি ব্যাংক নয়, অনেকগুলো ব্যাংকে কী ঘটেছে তা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের ‘টপ প্রায়োরিটি’ বা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে। পুরো ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে এখন একটি ‘ক্লিনিং প্রসেস’ বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে গত কয়েক বছরে সংঘটিত সব অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের তদন্ত হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে অব্যাহত রয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনিয়ম ও ঋণখেলাপি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইউবী। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তদবির, ঘুষ-বাণিজ্য এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোনের নামে লুটপাট করা হয়েছে, যার কারণে ব্যাংকটির প্রায় ৬১ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এখনো সেই পুরোনো সিন্ডিকেট লোন উত্তোলন ও প্রদানের চেষ্টা চালাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এই সিন্ডিকেট ভাঙা এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
আরও পড়ুন
রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি টাকা
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আর্থিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে যেতে হলে এটি নিশ্চিত করতেই হবে। কেবল একটি ব্যাংক নয়, অনেকগুলো ব্যাংকে কী ঘটেছে তা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে। পুরো আর্থিক খাতের জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা সম্ভব না হলেও এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর এলাকার কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার (হিমাগার) ও কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চান। জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের জন্য চলমান তহবিলের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন, যেখানে গ্রামীণ এলাকা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এছাড়া কৃষি ও পল্লি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনরর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষিখাতে ঋণ বিতরণের জন্য ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমদানি বিকল্প ফসল চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন
সংসদে অর্থমন্ত্রী / রাজস্ব ফাঁকি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থানে
অর্থমন্ত্রী জানান, এই সব সুবিধা সারাদেশের জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় নির্দিষ্ট করে কোনো উপজেলার জন্য আলাদা করে ঋণ সুবিধা চালুর প্রয়োজন নেই।
এই বক্তব্যের পর একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকে গত ১৫ বছরে যে পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশই খেলাপি। বিশেষ করে জনতা ব্যাংকের ৭০ শতাংশ খেলাপিঋণই এসআরএম, বেক্সিমকো, অ্যালন টেক্স গ্রুপ ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়েছে। যারা এই বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট করে পরিশোধ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা জানতে চান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নটি মূল বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে গেছেন, তাদের ব্যাপারে এই সরকার কোনো কম্প্রোমাইজ বা আপস করবে না। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং সম্পত্তি ক্রোকের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সংসদে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এর আগেও দেওয়া হয়েছে এবং এই কঠোর ধারা বজায় থাকবে বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
আরও পড়ুন
‘মদ ও জুয়া নিষিদ্ধকরণ’ বিলসহ দুটি বিল সংসদে উত্থাপনের পরে প্রত্যাহার
এরপর কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ তার অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের দুর্বলতা ও অনিয়মের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই ব্যাংকটিকে নিয়ে নানা অনিয়মের খবর প্রকাশ পায়। আগে এখানে একটি গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নামে লুটপাট করেছে, এখন তারা খোলস বদলে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই ব্যাংকটিকে কৃষকবান্ধব করতে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে তদন্তের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না তা জানতে চান তিনি।
আতিকুর রহমান মুজাহিদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপির ব্যাংক দখল প্রক্রিয়া বা প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই। কোনো ব্যাংকেই এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো নিয়োগ বা পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বর্তমানে একটি গভীর বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা চলছে, যা সম্পন্ন হলে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
এমওএস/ইএ








