সাকিব, অস্ট্রেলিয়া

বাইরে থেকে অস্ট্রেলিয়ার ছাত্রজীবন যতটা সহজ এবং আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে তা মোটেও তেমন নয়। ঘরভাড়া, পড়াশোনার খরচ, চাকরি, রান্না, ঘরদোর পরিষ্কার করা-সবকিছু একহাতে সামলাতে হয়।

এই দূর পরবাসে এসে ছাত্রজীবনের কঠিন দিনগুলো পার করতে গিয়ে আমি খুব ভালোভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছি, যা আমার পুরো জীবনদর্শন বদলে দিয়েছে।

১. অর্থ গুরুত্বপূর্ণ, তবে সময়ানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলা আরও বেশি জরুরি

অস্ট্রেলিয়ায় এসে অনেকেই চাকরি, ঘরভাড়া আর বিলের পেছনে এত বেশি দৌড়ান যে পড়াশোনা, ক্লাসের পড়া এবং পরীক্ষার শেষ সময়গুলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়। আমি নিজেও বুঝেছি, শুধু কাজ করলেই হবে না, নিজের একটা দৈনন্দিন রুটিন বা নিয়ম বজায় রাখতে হবে।

কখন কাজ করব, কখন পড়ব, আর কখন বিশ্রাম নেব- এই ভারসাম্য রক্ষা করা খুব জরুরি। নিজের জীবনে শৃঙ্খলা না থাকলে প্রবাসের ছাত্রজীবন খুব সহজেই এলোমেলো হয়ে যায়।

২. কোনো কাজই ছোট নয়

নিজের দেশে থাকার সময় আমরা অনেক সময় কাজ নিয়ে সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করি। কিন্তু এখানে এসে বুঝলাম, সৎ শ্রম মানেই সৎ শ্রম। খণ্ডকালীন চাকরি শুধু টাকা দেয় না, বরং ধৈর্য শেখায়, দায়িত্ববোধ শেখায়, মানুষের সাথে মেলামেশা করতে শেখায় এবং বাস্তব জীবনকে বুঝতে সাহায্য করে। এখানে আপনি যে কাজই করুন না কেন, প্রতিটা কাজের সময় আপনাকে নতুন কিছু না কিছু শেখাবেই।

৩. স্বাস্থ্যই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ

ছাত্রজীবনে ঘরভাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন, চাকরি আর পড়াশোনার চাপ সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে কোনো কিছুই ঠিকমতো সামলানো যায় না। অনেক সময় আমরা বাড়তি আয়ের জন্য অতিরিক্ত কাজ করি, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকি, কম ঘুমাই আর ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করি না।

এগুলোকে আমরা সাধারণ বিষয় মনে করলেও শরীর একটা সময় ঠিকই ভাঙনের সংকেত দিতে শুরু করে। তাই নিজের ঘুম, খাবার, মানসিক স্বাস্থ্য আর বিশ্রামের দিকে খেয়াল রাখা খুব দরকার। টাকা আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু স্বাস্থ্যকে অবহেলা করলে জীবন আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায়।

এই দীর্ঘ পথচলা আসলে একজন মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। এটি আপনাকে লড়াই করতে শেখায়, ধৈর্য ধরায়, নিয়মানুবর্তিতা শেখায় এবং নিজের ভবিষ্যতের জন্য ধীরে ধীরে ভিত গড়তে সাহায্য করে।

এখানে আরও একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ: দুশ্চিন্তা আর হতাশা আসবেই। প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ বা পরীক্ষা আসবে-কখনো পড়াশোনা নিয়ে, কখনো চাকরি নিয়ে, আবার কখনো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। কিন্তু এগুলোকে জয় করাটাও একটা বড় দক্ষতা।

দুশ্চিন্তা নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। ধীরে ধীরে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন কীভাবে মানসিক চাপ সামলাতে হয়, কীভাবে নিজেকে মানসিকভাবে শক্তিশালী রাখতে হয়। এই মানসিকতা তৈরি করতে পারলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়।

মনে রাখবেন, ছাত্রজীবন মানেই শুধু খণ্ডকালীন চাকরি করা নয়। ছাত্রজীবন হলো শিক্ষা, ভারসাম্য, আত্মউন্নয়ন এবং নিজের মূল লক্ষ্যকে ভুলে না যাওয়ার নাম। তাই পড়াশোনাকে অবশ্যই সবার আগে অগ্রাধিকার দিন; কারণ জ্ঞান, দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারলে আপনি জীবনের দৌড়ে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবেন।

এমআরএম