ইউরোপজুড়ে বইছে রেকর্ড ভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহ। এই আবহাওয়াতেও দক্ষিণ ইতালির পুলিয়া অঞ্চলের ফসলের ক্ষেতে রোদে পুড়ে ধুঁকতে ধুঁকতে কাজ করছেন হাজারো অভিবাসী কৃষিশ্রমিক।

একদিকে তীব্র রোদ আর অন্যদিকে কম মজুরির চরম শ্রম শোষণ সব মিলিয়ে এক অমানবিক দাসত্বের জীবন পার করছেন তারা। কাজ শেষে যেখানে তারা একটু বিশ্রামের খোঁজে ফেরেন, ইতালির ফোজ্জার উপকণ্ঠের সেই ‘বোরগো মেজজানোনে’ ঝুপড়িবসতিটি যেন এক জীবন্ত নরক।

সাবেক একটি সামরিক বিমানঘাঁটির পরিত্যক্ত রানওয়ের ওপর গড়ে উঠেছে এই বিশাল ঝুপড়িবসতি। গ্রীষ্মের এই মৌসুমে যখন তরমুজ, অ্যাপ্রিকট এবং চেরি তোলার ধুম পড়ে, তখন এশিয়ান ও আফ্রিকান দেশগুলো থেকে আসা প্রায় চার হাজার মৌসুমি শ্রমিক এখানে আশ্রয় নেন।

পুরো বসতি এলাকাটি গাছের সুশীতল ছায়াহীন এক মরুভূমির মতো। চারদিকের বাতাস পুড়ে যাওয়া আবর্জনার ধোঁয়া এবং ভেড়ার মাংসের পোড়া গন্ধে ভারী হয়ে থাকে। তীব্র গরমের মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রমের পর শ্রমিকরা যখন সাইকেল চালিয়ে এখানে ফেরেন, তখন তাদের শীতল হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। লোহার তৈরি ঘরগুলো গরমে ফুটন্ত চুল্লির মতো হয়ে ওঠে।

এই বিশাল বসতিতে নেই কোনো পানীয় জলের সুব্যবস্থা, নেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা মাত্র দুটো জলের ট্যাঙ্ক থেকে বাসিন্দাদের শপিং কার্ট ব্যবহার করে জল টেনে আনতে হয়। সেই জলও সরাসরি পান করা বা স্নানের যোগ্য নয়; ব্যবহারের আগে তা ফুটিয়ে নিতে হয়। গরমের দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে মাটির রাস্তাগুলো যখন কাদায় পরিণত হয়, তখন জল আনা আরও দূরহ হয়ে ওঠে।

গিনির ৪০ বছর বয়সী শ্রমিক মামাদু সারাফু দিয়ালো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে জীবন ধারণ করা অসম্ভব কঠিন... অনেকেই কাজ থেকে ফিরে পানির অভাবে স্নান না করেই ঘুমিয়ে পড়তে বাধ্য হয়।”

নাইজেরিয়ার ৪৭ বছর বয়সী নারী ফ্লোরেন্স একহাটোরো জানান, তীব্র গরমে রাতে ঘুমানো যায় না। বেঁচে থাকার তাগিদে এই গরমের মধ্যেই তাকে দরজার সামনে গ্রিলে আগুন ধরিয়ে মাছ ও মাংসের পাই বানাতে হয় বিক্রির জন্য।

মানবিক সংস্থা ‘ইন্টারসোস’-এর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই অমানবিক জীবনযাপনের কারণে শ্রমিকরা মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। সংস্থাটির ফোজ্জা প্রকল্পের নেতা ফ্রানচেস্কা পালাজ্জো বলেন, “তীব্র গরমে শ্রমিকরা সব সময় তৃষ্ণার্ত থাকে। আমাদের ক্লিনিকে আসা বেশিরভাগ রোগীই হিট স্ট্রোক ও তাপ-সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন।”

ক্লিনিকের বাইরে অসুস্থ কুকুর ও গবাদিপশুদেরও পানির জন্য হাহাকার করতে দেখা যায়। পালাজ্জো জানান, গত তাপপ্রবাহে এক যুবকের আশ্রয় দেওয়া দুটি কুকুরছানা তীব্র গরমে মারা গেলে, সেই যুবককে অসহায়ভাবে কাঁদতে দেখা গেছে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই শ্রমিকদের উপযুক্ত আবাসন ও পুনর্বাসনের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতালিকে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো (৫.৪ মিলিয়ন) তহবিল দিয়েছিল। কিন্তু বিশেষ কমিশনার নিয়োগ করার পরও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইতালি সরকার সেই অর্থ ব্যয় করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে পুরো তহবিলটি হাতছাড়া হয়ে গেছে।

চলতি মাসের শুরুতে এই ঝুপড়িবসতি পরিদর্শন করে দেশটির সংসদ সদস্য ও বিরোধী দল ‘ফাইভ স্টারস’ এর নেতা মার্কো পেলেগ্রিনি তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ইইউ তহবিল হারিয়ে ফেলাকে প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির ডানপন্থি জোট সরকারের “সম্পূর্ণ ব্যর্থতা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

সংসদ সদস্য মার্কো পেলেগ্রিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার ইচ্ছে করেই এই বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। কারণ তারা এই অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়মিতকরণ বা বৈধতা দেওয়ার পক্ষপাতি নয়। অভিবাসীরা এখানে প্রায়শই শোষণের শিকার হচ্ছে, খুব কম মজুরিতে ক্ষেতে অতিরিক্ত খাটানো হচ্ছে। আর কাজ শেষে এই বসতিতে ফিরে আসাটা তাদের জন্য একটা চরম শাস্তির সমান।”

এমআরএম