কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন এমন বাস্তবসম্মত ছবি তৈরি করতে পারে যে, আসল আর নকলের পার্থক্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মানুষের মুখাবয়বের ক্ষেত্রে এআই-নির্মিত ডিপফেক এতটাই নিখুঁত হচ্ছে যে অনেক সময় সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিশেষজ্ঞরাও বিভ্রান্ত হন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষকে কি এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব, যাতে তারা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি সহজে শনাক্ত করতে পারেন?
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাবারডিন এবং অস্ট্রেলিয়ার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এএনইউ)–এর একদল গবেষক এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প সময়ের প্রশিক্ষণেই মানুষের ডিপফেক শনাক্ত করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
কেন এখন ডিপফেক শনাক্ত করা কঠিন?
কয়েক বছর আগেও এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে সহজেই ভুল ধরা পড়তো। কোথাও অতিরিক্ত আঙুল, কোথাও কানের অস্বাভাবিক গঠন কিংবা মুখের বিকৃতি দেখে বোঝা যেত যে ছবিটি কৃত্রিমভাবে তৈরি।
কিন্তু আধুনিক এআই সেই ভুলগুলো থেকে শিখেছে। ফলে এখনকার ডিপফেক অনেক বেশি নিখুঁত।
গবেষক অধ্যাপক অ্যামি ডাওয়েল বলেন, আগে মানুষকে অতিরিক্ত আঙুল বা অস্বাভাবিক অলংকারের মতো দৃশ্যমান ভুল খুঁজতে শেখানো হতো। কিন্তু এখন এআই এতটাই উন্নত হয়েছে যে এসব ভুল খুব কমই দেখা যায়।
কীভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়?
গবেষণায় স্টাইলজিএএন৩ নামের একটি উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাজার হাজার কৃত্রিম মুখাবয়ব তৈরি করা হয়।
অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই পরীক্ষা নেওয়া হয়। এরপর তাদের ছয়টি বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর দিতে শেখানো হয়।
সেগুলো হলো—
সমতা: এআই সাধারণত খুব বেশি নিখুঁত ও সমান মুখ তৈরি করে। অথচ বাস্তব মানুষের মুখে ছোটখাটো অসমতা থাকে।
অনুপাত: মানুষের মুখের স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা।
আকর্ষণীয়তা: এআই অনেক সময় অস্বাভাবিকভাবে সুন্দর ও নিখুঁত মুখ তৈরি করে।
স্বাতন্ত্র্য: বাস্তব মানুষের মুখে আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে, কিন্তু এআইয়ের তৈরি মুখ অনেক সময় একই ধরনের বা সাধারণ দেখায়।
অভিব্যক্তি: কৃত্রিম মুখে আবেগের প্রকাশ তুলনামূলক কম থাকে।
মনে রাখার মতো বৈশিষ্ট্য: এআইয়ের তৈরি মুখ অনেক সময় সহজে মনে থাকে না।
গবেষকদের মতে, এসবের কোনো একটিই ডিপফেক শনাক্ত করার নিশ্চিত উপায় নয়। বরং সবগুলো বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে একটি ধারণা তৈরি করতে হয়।
এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণেই বড় পরিবর্তন
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক ঘণ্টার মতো প্রশিক্ষণের পর অংশগ্রহণকারীদের ডিপফেক শনাক্ত করার সাফল্যের হার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
কয়েকজন অংশগ্রহণকারী প্রায় ১০০ শতাংশ নির্ভুলভাবে আসল ও নকল ছবি আলাদা করতে সক্ষম হন।
গবেষকদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কও অনেকটা এআইয়ের মতোই কাজ করে। বারবার উদাহরণ দেখে শেখার মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে আরও দক্ষ হয়ে ওঠে।
আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রশিক্ষণের আগে অনেকেই নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, অথচ ভুলও বেশি করতেন।
প্রশিক্ষণের পর অংশগ্রহণকারীদের আত্মবিশ্বাস যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও।
কেন ডিপফেক শনাক্ত করা জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রতারণা ও জালিয়াতি।
আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট পূর্বাভাস দিয়েছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এআই-ভিত্তিক ডিপফেক প্রতারণায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আগামী বছর ৪০ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে। ২০২৩ সালে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন পাউন্ড।
প্রতিবেদনে হংকংয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে এক কর্মী ভিডিও কলে বসের ডিপফেক দেখে প্রতারকদের কাছে ২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড সমপরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে দেন।
রাজনৈতিক অপব্যবহারও বাড়ছে
ডিপফেক প্রযুক্তি রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তিতেও ব্যবহার হচ্ছে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
২০১৯ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)–এর এক তদন্তে দেখা যায়, ‘কেটি জোন্স’ নামে লিংকডইনের একটি প্রোফাইল ও ছবিটি আসলে কৃত্রিমভাবে তৈরি। ওই ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ায় এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক প্রচারণার কনটেন্টে বাধ্যতামূলকভাবে ওয়াটারমার্ক বা বিশেষ চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে
তবে গবেষকরা মনে করেন, ডিপফেক বা এআই প্রযুক্তির সব ব্যবহার নেতিবাচক নয়।
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা কোনো শিশুর বয়স বাড়লে তার সম্ভাব্য চেহারা দ্রুত তৈরি করা, চলচ্চিত্র বা সৃজনশীল কাজে বাস্তবসম্মত ভিজ্যুয়াল তৈরি করাসহ বিভিন্ন ইতিবাচক ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।
তাদের মতে, স্বচ্ছতা বজায় রেখে এবং মানুষকে জানিয়ে এআই ব্যবহার করা হলে এটি সমাজের জন্য উপকারী প্রযুক্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
এমএসএম








