আধুনিক বিমানবাহী রণতরির ইতিহাসে অন্যতম কঠিন অপারেশনাল মাইলফলক অর্জন করেছে মার্কিন নৌবাহিনীর নিমিটজ শ্রেণির সুপারক্যারিয়ার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অভিযানে অংশ নিয়ে জাহাজটি টানা ২০০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করেছে।

দীর্ঘ সময় সমুদ্রে মোতায়েনের পাশাপাশি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি বহরের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিনে।

চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা, রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে বিমানবাহী রণতরিগুলোকে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে মোতায়েন রাখছে মার্কিন নৌবাহিনী।

ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ থ্রি-এর ফ্ল্যাগশিপ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার নৌঘাঁটি সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। শুরুতে এটি নিয়মিত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মোতায়েন করার কথা ছিল। ১১-১২ ডিসেম্বর গুয়ামে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির পর মাত্র একদিনের মধ্যে জাহাজটি আবার সমুদ্রে ফিরে যায়।

গুয়াম ছাড়ার পর জাহাজটি প্রথমে দক্ষিণ চীন সাগরে অভিযান চালায়, এরপর ভারত মহাসাগর হয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে উত্তর আরব সাগরে আসে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হলে আব্রাহাম লিংকনের এয়ার উইং ইরান যুদ্ধে অংশ নেয়। এই রণতরিটি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় অংশ নেওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

জাহাজটিতে কর্মরত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন বিমানবাহী রণতরির ইতিহাসে টানা সমুদ্রে অবস্থানের দিক থেকে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে আব্রাহাম লিংকন।

জাহাজটির কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার অ্যালেক্সিস ট্রাভিস বলেন, আধুনিক যেকোনো বিমানবাহী রণতরীর মধ্যে টানা সবচেয়ে বেশি দিন সমুদ্রে থাকার রেকর্ড এখন আমাদের।

যদিও ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড প্রায় ৩২৬ দিনের দীর্ঘতম সামগ্রিক মোতায়েন সম্পন্ন করেছিল। তবে এই সময়ের মধ্যে জাহাজটি ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে একাধিকবার নোঙর করেছিল। ফলে আব্রাহাম লিংকনের মতো টানা সমুদ্রে থাকার নজির গড়তে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, আব্রাহাম লিংকনের এই দীর্ঘ মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। গত এক দশকে বিমানবাহী রণতরিগুলোকে আগের চেয়ে বেশি সময় সমুদ্রে থাকতে হচ্ছে। ফলে সাগরে রণতরি মোতায়েনের সময়সীমা দীর্ঘ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নানা দায়িত্বের কারণে এই বহরের ওপর চাপ বাড়ছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর বিমানবাহী রণতরির সংখ্যা এখনো ১১টিতেই সীমাবদ্ধ। একই সময়ে পুরোনো নিমিটজ শ্রেণির জাহাজগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের চাপও বেড়েই চলেছে। জাহাজগুলোর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত ডিপো রক্ষণাবেক্ষণের সময় দীর্ঘ হচ্ছে এবং নৌ শিপইয়ার্ডে বিলম্বও বাড়ছে।

গত এক দশকে ইউএসএস হ্যারি এস. ট্রুম্যান, ইউএসএস ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড-এর দীর্ঘ সময় মোতায়েন এই প্রবণতারই উদাহরণ। লোহিত সাগরে হুথি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে অভিযান এবং গাজা যুদ্ধের পর আঞ্চলিক উত্তেজনা মোকাবিলায় এসব রণতরি দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ছিল।

এ ধরনের দীর্ঘ মোতায়েনের ফলে নাবিকদের ক্লান্তি, মনোবল হ্রাস এবং পরিবার থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। একই সঙ্গে জাহাজের ইঞ্জিন, ক্যাটাপল্ট, অ্যারেস্টিং গিয়ার, বিমান লিফট, রাডার এবং অন্যান্য সরঞ্জামের ক্ষয়ও দ্রুত বাড়ছে। ফলে বন্দরে ফেরার পর ব্যাপক রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ছে। যুদ্ধবিমানগুলোর ব্যবহারও বেড়ে যাওয়ায় তাদের কাঠামো ও ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে।

কেএম