টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকার মানুষের। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছেড়ে ইতোমধ্যে শত শত মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছেন। জেলায় ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে জেলায় ‘অতিভারী’ বর্ষণ হচ্ছে—যার পরিমাণ রেকর্ড করা হয়েছে ১৯০.৩ মিলিমিটার। এ বৃষ্টির তোড়ে ফের পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী হাজারো মানুষের চোখে-মুখে এখন ২০১৭ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতি।

এদিকে বৃষ্টির তাণ্ডবে বাঘাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় থেকে পড়া গাছের গুঁড়ির আঘাতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রবল বর্ষণে জেলার বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো পাহাড় ধস, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়া এবং সড়ক তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন পাহাড়ি বাসিন্দারা

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ের এ মরণফাঁদ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে জেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পুরো জেলায় মোট ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রাঙ্গামাটি শহরেই রয়েছে ১১টি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অবিরাম মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত শারমিন জানিয়েছেন, একটি মানুষেরও যেন প্রাণহানি না ঘটে সেই লক্ষ্যেই আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, জেলায় ১০০টিরও বেশি এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ২৯টিই রাঙ্গামাটি শহরে অবস্থিত। শহরের পৌর এলাকা, সদর উপজেলা, কাপ্তাই, কাউখালী ও বাঘাইছড়ির পাহাড়ের পাদদেশে জীবনবাজি রেখে বসবাস করা প্রায় ৮৪০ জন মানুষ ইতোমধ্যে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন পাহাড়ি বাসিন্দারা

আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া নুর জাহান বেগম তার ঘর হারানোর ভয় নিয়ে বলেন, বৃষ্টির তীব্রতায় ঘরের খুঁটি মাটি থেকে সরে যাওয়ায় নাতিকে নিয়ে তিনি লোকনাথ মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছেন।

একই কেন্দ্রে আসা মো. শুক্কুর জানান, রাতের আঁধারে বৃষ্টির বাড়বাড়ন্ত দেখে প্রাণের ভয়ে তারা সপরিবারে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছেন।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৩ জুন পাহাড়ধসে ১২০ জনের প্রাণহানির সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি রাঙ্গামাটিবাসী। সেই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।

জেলার কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব হোসেন জানান, সোমবার সকাল থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত জনসাধারণকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। উপজেলার ৩৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ যেন নিরাপদে থাকেন, সেজন্য প্রশাসন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন পাহাড়ি বাসিন্দারা

ইউএনও রাজীব হোসেন আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দারা নিজেরা স্বেচ্ছায় সরে না আসলে জানমালের সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনা হবে। পাহাড়ধসের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিলাইছড়ি ও বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়াও সড়কে পানি ওঠায় পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে আটকা পড়েছে ৬০০ পর্যটক। সড়কের পানি না কমায় পর্যটকরা আজও গন্তব্যে ফিরতে পারেনি বলে জানান সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা।

এছাড়া ভারী বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও চলমান এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

আবু দারদা খান আরমান/কেএইচকে/এএসএম