গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেওয়া ঘর এখন অনেক ক্ষেত্রে কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়েছে। নওগাঁর রাণীনগরের মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৩২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১২টি ঘর অর্থের বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কোথাও একই ঘর একাধিকবার বিক্রি হয়েছে, আবার কোথাও একজনের দখলে রয়েছে একাধিক ঘর। উপকারভোগী বাছাইয়ে অনিয়ম এবং তদারকির ঘাটতির সুযোগে গড়ে উঠেছে ঘর বেচাকেনার এই অনানুষ্ঠানিক বাজার- এমনটাই অভিযোগ প্রকল্পের বাসিন্দা ও স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা যায়, মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকটি ঘরে যারা বসবাস করছেন তাদের বড় একটি অংশের নাম সরকারি ঘর বরাদ্দের তালিকায় নেই। ঘরগুলো বিভিন্ন অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কিনে নেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন বর্তমান বাসিন্দাদের কেউ কেউ।

প্রকল্পের ৫ নম্বর ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। মেঝেজুড়ে দামি কার্পেট, দেওয়ালে ৪৩ ইঞ্চির স্মার্ট টেলিভিশন, ফ্রিজ ও নানা আসবাবে সাজানো। ঘরটি দেখে বোঝার উপায় নেই এটি গৃহহীনদের জন্য নির্মিত সরকারি আশ্রয়ণের ঘর। সরকারি নথি অনুযায়ী ঘরটির বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি মল্লিকা। তবে ঘরটি এরইমধ্যে দুই দফায় বিক্রি হয়েছে। প্রথমে মকবুল নামের এক ব্যক্তি এটি নেন, পরে তিনি ৭০ হাজার টাকায় সেটি বিক্রি করেন প্রবাসী সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা বিবির কাছে।

শুধু একটি নয়, প্রকল্পের ৬ নম্বর ঘরটিও বর্তমানে মর্জিনা বিবির দখলে। ওই ঘরের মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি রুবেল। তৃতীয় দফায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘরটি কিনে নেন মর্জিনা।

আবার ৭ নম্বর ঘরের বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি আরব হলেও সেখানে বসবাস করছেন আমিন নামের এক ব্যক্তি। তিনি ৭০ হাজার টাকায় ঘরটি কিনেছেন বলে দাবি করছেন। ৯ নম্বর ঘরটি ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় কিনে বসবাস করছেন আসাদুল নামের একজন। ১০ নম্বর ঘরে থাকছেন সফেটা নামের এক নারী। তিনি ৮০ হাজার টাকায় ঘরটি কিনেছেন বলে জানিয়েছেন।

আশ্রয়ণের ঘর বিক্রির ধুম, দাম ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা

১৪ নম্বর ঘরের বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি সিরাজুল ইসলাম। তবে সেখানে বসবাস করছেন শরিফ নামের এক ব্যক্তি। তিনি ৭০ হাজার টাকায় ঘরটি কিনেছেন। পাশের ১৩ নম্বর ঘর বিক্রির বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ১৫ ও ১৬ নম্বর ঘরের ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে একই চিত্র। দুটি ঘরের বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভিন্ন হলেও বর্তমানে উভয় ঘরই মিনা নামের এক নারীর দখলে। একটি ঘর তিনি নিজে কিনেছেন, অন্যটি তার ছেলে কিনেছে। এছাড়া ১৮ নম্বর ঘরে বসবাস করছেন শাহীন নামের এক ব্যক্তি, তিনি ৬০ হাজার টাকায় ঘরটি কিনেছেন বলে দাবি করেছেন।

১৯ নম্বর ঘরে রয়েছেন খাদিজা নামের এক নারী। ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় ঘরটি কিনেছেন বলে দাবি করেন তিনি। ২২ নম্বর ঘরটিও বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য একজনের দখলে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

প্রকল্পের ৫ নম্বর ঘরের বর্তমান বাসিন্দা মর্জিনা বিবি বলেন, ‘মকবুলের কাছে থেকে ৭০ হাজার টাকায় ঘরটি কিনেছি। সরকার এখনো কাগজপত্র আমাদের নামে দেয়নি। তবে দলিল ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে রেখেছি। শুধু আমিই নই, এই প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরই বিক্রি হয়েছে।’

প্রকল্পের এসব ঘর কেনাবেচায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে নাজমা বেগম নামে এক নারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যাদের ঘর দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেরই অন্য এলাকায় বাড়িঘর আছে। তারা এখানে থাকতে চান না। স্থানীয়দের মধ্যে যারা কিনতে চান, তাদের একটু সহযোগিতা করা দোষের কিছু নয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা জামাল খন্দকার, আব্দুল খালেকসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, প্রকৃত গৃহহীন স্থানীয়দের বাদ দিয়ে অন্য এলাকার লোকজনকে ঘর দেওয়ায় তারা পরে সেগুলো বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন। প্রকল্পে এমন কয়েকজনও ঘর পেয়েছেন, যাদের নিজস্ব বাড়িঘর ও জমিজমা রয়েছে। ৩২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১২টি ঘর এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। বর্তমানে একটি ঘরের দাম ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ্যা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক ও নারী গ্রাম পুলিশ ছাবিনা ইয়াসমিন মীমের বিরুদ্ধে নিজের ঘর বিক্রির চেষ্টা করার অভিযোগও রয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ঘর বিক্রির অভিযোগ শুনে আমি নিজেই বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছি। ইউএনও স্যারকে জানিয়েছি। চাকরির কারণে আমি ভাড়া বাসায় থাকি। অনেকে বার বার ফোন করে ঘর বিক্রির কথা বলায় রাগ করে তিন লাখ টাকা দাম বলেছি। কিন্তু আমি ঘর বিক্রি করতে চাই না।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি ফরিদ আলী বলেন, এখানে ৩২টি ঘর রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২টি ঘর অর্থের বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে। একই ঘর একাধিকবার বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে কথা হলে রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাকিবুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৩২টি ঘরের মধ্যে ১২টি ঘর বেচাবিক্রির প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এসব ঘরের বরাদ্দ বাতিলের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জেলা কৃষি খাস জমি ব্যবস্থ্যাপনা কমিটির মিটিংয়ে এসব ঘরের বরাদ্দ বাতিল করা হবে। সেইসঙ্গে দলিল বাতিলের জন্য মামলা রুজু করা হবে।

আরমান হোসেন রুমন/এফএ/এমএস