জমেছে মেঘ, জমে উঠেছে জম্পেশ আড্ডা। আষাঢ়ে বৃষ্টিতে ঘনীভূত হচ্ছে অবিশ্বাস্য আর আজগুবি সব গল্প। এমনই জমজমাট আষাঢ়ে গল্প নিয়ে এ আয়োজন

মির্জাদের কুয়ার একটা দুর্নাম আছে। মহল্লায় কানাঘুষা, এই কুয়ার কোনো তলা নাই। এর মধ্যে কেউ যদি একটা পাথরের টুকরা ফেলে কুয়ার মুখে কান পেতে বসে থাকে, সারা দিনেও সেই পতনের কোনো আওয়াজ পাবে না। না কোনো পানির উপরিতল স্পর্শ করার অস্পষ্ট ছলাৎ শব্দ, না কোনো মেটে তলদেশে আছড়ে পড়ার ভোঁতা আওয়াজ। কুয়ার মুখে সারাক্ষণ এক অদ্ভুত, গাঢ় নিস্তব্ধতা লেপটে থাকে, যেন আওয়াজহীনতাও এমন একটা কিছু, যাকে স্পর্শ করা যায়। আর সেই স্পর্শ ভেজা–ভেজা, শেওলা ধরা।

জাকির হোসেন রোডের মহল্লাবাসী কুয়া নিয়ে এই কুসংস্কার খুব যে বিশ্বাস করে, এমন নয়। তবে কুয়াটাকে তারা সমীহ করে। মানে, এটার চারপাশে খুব একটা ঘেঁষে না কেউ। না ঘেঁষার একটা বড় কারণ, মির্জাদের বাড়িটা প্রায়–পরিত্যক্ত। অনেক দিন হলো সেই বাড়িতে কোনো স্থায়ী বাসিন্দা নেই।

মূল দোতলা বাড়ির পেছনে একটা ছোট বাগান। আম, লিচু আর জামরুলগাছে ছাওয়া সেই বাগান অযত্নে জঙ্গলের রূপ নিয়েছে। বাগানের কোনায় একটা উঁচু জামগাছের ছায়ায় শানবাঁধানো কুয়াতলা। কুয়ার মুখে কোমরসমান উঁচু সিমেন্টের রেলিংয়ের ঘের। কুয়াতলায় শুকনো জামপাতা পড়ে থাকে। তার ওপর দিয়ে কোনো বিড়াল কখনো হেঁটে যায় না। কোনো পাখিও এসে বসে না কুয়ার রেলিংয়ে। সবাই যেন এড়িয়ে চলে জায়গাটা।

পরিত্যক্ত বাড়ির দেখাশোনা করে শ্যামল নামের এক মাঝবয়সী অলস লোক। একসময় সে ডাকপিয়নের চাকরি করত বলে শোনা যায়। চাকরি গেছে আলস্যের কারণে। দোতলা বাড়ির নিচতলার একটি ঘরে সে থাকে। মহল্লার হোটেল-রেস্তোরাঁয় খায়। কারণ, চুলা ধরিয়ে রান্না চাপানোর মতো উদ্যোগ নিতে তার হাত চলে না। কেউ কেউ বলে, এমনকি জামাকাপড়ও সে ধোপার কাছে ধুতে দেয়।

শ্যামল দাবি করে, মাঝে মাঝে কুয়ার ভেতর থেকে অস্পষ্ট কিছু আওয়াজ উঠে আসে। কোনো কোনো ঝিম-ধরানো দুপুরবেলা হয়তো সে বাড়ির ভেতরের দিকের বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়েছে। তার ঘুম ভেঙেছে অচেনা কিছু শব্দ। অনুসন্ধান করে সে দেখেছে কুয়াতলা থেকে আসছে সেসব শব্দ। কিসের শব্দ? দুটো মানুষ যেন তর্ক করছে, বা কেউ কাউকে ডাকছে। অচেনা ভাষা। মাঝে মাঝে যান্ত্রিক শব্দও ভেসে আসে। যেন একটা ট্রেন যাচ্ছে কোথাও। কোনো কোনো অমাবস্যার রাতেও কুয়ার অতল থেকে শব্দ আসে। খুব মিহি। প্রায় শোনাই যায় না।

মহল্লার কোনো বাসাতেই কুয়া নেই। থাকার প্রশ্নও আসে না। টিউবওয়েলই উঠে গেছে সেই কবে। সবার বাসায় ট্যাপের পানি। মির্জাদের বাসায় এই এক সাবেকি কুয়া থেকে গেল কীভাবে, সে এক রহস্য। এ রকম শোনা যায়, তাদের এখানে বাসা করার আগে থেকে কুয়াটা ছিল। সরকার এখানে প্লট বানিয়ে দেওয়ারও আগে থেকে। শ্যামল দাবি করে, এই কুয়া এখানে অনন্তকাল ধরে আছে। কেউ এটা খোঁড়েনি। এটা বন্ধও কেউ করতে পারবে না। অতল কুয়া বন্ধ করবে কী করে?

মহল্লার বুড়ো চৌকিদার ইমানকে সঙ্গে নিয়ে শ্যামল যখন কুয়ার পাড়ে এল, তখন আসরের আজান পড়ছে। বিকেলের একটা তেরছা রোদ এসে কেমন হাঁ করা একটা বোয়াল মাছের মুখের আকার দিয়েছে কুয়ার মুখটাকে। উঁচু পাড় কালচে-সবুজ ঘন শেওলার গালিচায় আবৃত। বিকেলের রোদে সেটা কমলা আগুনের মতো দেখাচ্ছে। শ্যামল কুয়ার গহ্বরে মুখ রেখে ‘হোই’ বলে একটা চিৎকার দিল। সেই শব্দ নিচে নেমে গিয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল না। শ্যামল ভেবেছিল, তার শব্দে একঝাঁক চামচিকা বা বাদুড় ছিটকে বেরিয়ে আসবে। কিছুই না।

কুয়াতলা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে শ্যামল। আমাদের ক্রিকেট বল উড়ে গিয়ে কুয়াতলায় পড়লে শত অনুরোধেও সে সেটা কুড়িয়ে এনে দেয় না। আমাদেরও সেখানে যেতে দিতে রাজি হয় না।

ভাগ্যের কী ফের, শ্যামলকে এই কুয়ায় নামতে হলো। একটা পুতুল কুড়াতে।

মির্জাবাড়ির চার ভাইয়ের কে যে চাকরিসূত্রে কোথায় থাকে কে জানে। তারা কেউ আসে না। শুধু ফিলিপাইনে থাকা তৃতীয় ভাই আদিল এহসান মির্জা বছরে একবার বেড়াতে আসেন পরিবার নিয়ে। নিজ ভিটার প্রতি তাঁর নস্টালজিক টান প্রবল। এসে মোহাম্মদপুরের পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করেন। আড্ডা দেন। তারপর চলে যান।

এবার তিনি এলেন তিন বছর পর। সঙ্গে এক নতুন বিদেশি স্ত্রী। আগের সংসার ভেঙে গেছে। নতুন স্ত্রী পাকিস্তানি। শেহনাজ তাবাসসুম। বয়সে তাঁর চেয়ে সামান্য বড়। তাঁদের তিন বছর বয়সী ফুটফুটে কন্যাশিশুর নামও তাবাসসুম।

এহসান মির্জা এবার এসেছেন বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে। তাঁর আরও তিন ভাই এবং এক বোনের শরিকানার কারণে বাড়ি বিক্রির আলোচনা জটিল। তিনি এই সব নিয়ে খুব ব্যস্ত। শিশুকন্যা তাবাসসুম একা একা সারা বাড়ি খেলে বেড়ায়। এভাবে খেলতে খেলতে তার কাপড়ের পুতুল কী করে যেন কুয়ার মধ্যে পড়ে গেল। নিঃসীম কুয়ার ভেতরে অন্ধকারে সেটা হারিয়ে গেল।

স্ত্রী শেহনাজ তাবাসসুম উর্দু ভাষায় নিচুস্বরে স্বামীকে যেটা বললেন তার অর্থ, কুয়া থেকে পুতুল তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। এহসান মির্জা শুরুতে সে পথ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। ছোটবেলা থেকে তিনি এই কুয়ার ইতিহাস জানেন। কিংবা বলা যায়, তিনি এটুকু জানেন যে এটা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। এ কুয়ায় কাউকে নামানোর চিন্তা করতে তার মন সায় দিল না। কিন্তু স্ত্রীকে না বলার মতো মনের জোর তাঁর কম। ফলে দ্বিতীয়বার যখন শেহনাজ কুয়ায় কাউকে নামানোর কথা বললেন, এহসানের আর উপায় থাকল না। তিনি শ্যামলকে নির্দেশ দিলেন কুয়ায় নামতে।

শ্যামল কিছুতেই কুয়ায় নামবে না। সে লোক জোগাড় করার চেষ্টা করল। বলল, কুয়ায় নামার ব্যাপারে এক্সপার্ট লোক আনবে। কিন্তু কাউকেই সে পেল না। যে শহরে কোনো কুয়াই নেই, সেখানে কুয়ায় নামায় দক্ষ লোক কোথায় পাওয়া যাবে? তাবাসসুমের জেদ মেশানো কান্নার সামনে খুব বেশি খোঁজাখুঁজির অবকাশও নেই। ফলে শ্যামলকে নামতে বাধ্য হতে হলো।

মহল্লার বুড়ো চৌকিদার ইমানকে সঙ্গে নিয়ে শ্যামল যখন কুয়ার পাড়ে এল, তখন আসরের আজান পড়ছে। বিকেলের একটা তেরছা রোদ এসে কেমন হাঁ করা একটা বোয়াল মাছের মুখের আকার দিয়েছে কুয়ার মুখটাকে। উঁচু পাড় কালচে-সবুজ ঘন শেওলার গালিচায় আবৃত। বিকেলের রোদে সেটা কমলা আগুনের মতো দেখাচ্ছে।

শ্যামল কুয়ার গহ্বরে মুখ রেখে ‘হোই’ বলে একটা চিৎকার দিল। সেই শব্দ নিচে নেমে গিয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল না। শ্যামল ভেবেছিল, তার শব্দে একঝাঁক চামচিকা বা বাদুড় ছিটকে বেরিয়ে আসবে। কিছুই না।

শ্যামলের মুখে ধরা টর্চ। সেটার আলোয় কুয়ার দেয়াল দেখা যাচ্ছে। দেয়ালে শেওলা আর নানা রকম ফার্নের ঘন ঝোপ। শুরুর দিকে শেওলার রং ছিল কালচে সবুজ। ধীরে ধীরে রং ধূসর হয়ে এল। কমে এল শেওলা আর ঝোপের ঘনত্ব। তারপর একসময় সেগুলো নাই হয়ে গেল। কারণ, বাঁধানো দেয়ালও শেষ। এরপর মাটির দেয়াল। কেমন একটা মেটেল গন্ধে ভরে আছে চারপাশ।

চৌকিদার ইমান এক টুকরা পাটকেল জোগাড় করে সেটা ছুড়ে দিল কুয়ার গহ্বরে। দুজনে কান পেতে অপেক্ষা করল কিছুক্ষণ। ‘ঝুপ’ করে কোনো আওয়াজ এল না। শুধু একটা গোল অন্ধকার তাকিয়ে থাকল তাদের দুজনের দিকে।

শ্যামল এবার পকেট থেকে একটা টর্চ বের করল। পুরোনো আমলের অ্যালুমিনিয়ামের লম্বা টর্চ। তিনটা চ্যাপটা মোটা ব্যাটারি। সেটা অন করে সে তাক করল কুয়ার অন্ধকারে। একটা ছুরির ফলার মতো সেটা নেমে গেল নিচে। কিন্তু নেমেই গেল। কোথাও বাধা পেল না। নামতে নামতে ফিকে হয়ে একসময় হারিয়ে গেল একটা ধূসরতায়।

টর্চ বন্ধ করে সেটা কোমরে গুঁজে নিল শ্যামল। এবার নামতে হবে। লুঙ্গি মালকোঁচা করে বাঁধল সে। গায়ের ফতুয়াটা খুলে ফেলে উদোম হলো।

দুই গাছি দড়ি আনা হয়েছে, একটার সঙ্গে আরেকটা বাঁধা হলো। দেড় শ ফুট দড়ি। দুনিয়ার যেকোনো কুয়ার জন্য অতিরিক্ত। তবে দড়ি গোছানোর সময় দুজনেরই মনে হলো, এ কুয়ার জন্য হয়তো এ দৈর্ঘ্য যথেষ্ট নয়।

দড়ির একটা প্রান্ত বাঁধা হলো লোহার আঁকশিতে। সেই আঁকশি আটকে দেওয়া হলো জামগাছের কাণ্ডে বেড় দিয়ে। অপর প্রান্ত কোমরে বাঁধল শ্যামল। তারপর উঠে বসল কুয়ার পাড়ে। শেওলার মখমলে শিরশির করে উঠল পায়ের পাতা। টর্চটা মুখে কামড়ে ধরল সে। তাকাল ইমানের দিকে। বিদায় নিচ্ছে যেন।

ইমান বলল, ‘সমস্যা হইলে আওয়াজ দিস। টাইনা তুলুম।’

মাথা নাড়ল শ্যামল। তারপর আলতো করে শরীর গলিয়ে দিল অন্ধকার গুহামুখে।

ইমানের হাতে দড়ির গাছা। সেখান থেকে সে একটু একটু করে ঢিল ছাড়ছে।

কুয়ার দেয়ালে পা রেখে একটু বাঁকা হয়ে নামতে শুরু করল শ্যামল। যেন সে চাঁদের মাটিতে পেছন দিকে হাঁটছে। তাকে এই কুয়ার তল খুঁজে বের করতে হবে। সেই তলায় পড়ে আছে একটা কাপড়ের পুতুল।

কিছু দূর নেমে শ্যামল ওপরের দিকে তাকাল। বেশ উঁচুতে কুয়ার মুখটা একটা আলোর বৃত্ত হয়ে আছে। বিকেলের রোদ পড়ে আসছে। অন্ধকার নামার আগেই কুয়ার তল পেতে হবে। শ্যামল নামার গতি বাড়িয়ে দিল। ওপরের আলোর বৃত্ত ক্রমে ছোট হয়ে আসছে।

শ্যামলের মুখে ধরা টর্চ। সেটার আলোয় কুয়ার দেয়াল দেখা যাচ্ছে। দেয়ালে শেওলা আর নানা রকম ফার্নের ঘন ঝোপ। শুরুর দিকে শেওলার রং ছিল কালচে সবুজ। ধীরে ধীরে রং ধূসর হয়ে এল। কমে এল শেওলা আর ঝোপের ঘনত্ব। তারপর একসময় সেগুলো নাই হয়ে গেল। কারণ, বাঁধানো দেয়ালও শেষ।

এরপর মাটির দেয়াল।

কেমন একটা মেটেল গন্ধে ভরে আছে চারপাশ।

শ্যামল টর্চটা মুখ থেকে হাতে নিতে গিয়ে সেটা ফসকে গেল। নিচে অন্ধকারের দিকে ছুটে গেল টর্চ।

শেষ মুহূর্তে অন্ধকারের অতল থেকে লাফিয়ে উঠে এল যে জিনিসটা, সেটা ছোট বিড়াল আকৃতির একটা ধবধবে সাদা কিছু। আর তার ধাতব গায়ে ঠিকরে পড়ল ইথানের এলইডির আলো। স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ায় বাঁ হাতে খপ করে জিনিসটা ধরে ফেলল ইথান। চোখের সামনে সেটা এনে সে বিস্মিত হলো। তার হাতে ধরা একটা পুরোনো আমলের তিন ব্যাটারির অ্যালুমিনিয়ামের টর্চ।

অ্যালুমিনিয়ামের এক্সটেনশন ল্যাডার কুয়ার মুখ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফায়ারকর্মী ইথান কোল কুয়ার মুখের পাথুরে বেড়ায় বসে নিচে তাকাল। তার হেলমেটের মধ্যে লাগানো এলইডি লাইটের আলোর রেখা নিচে কিছু দূর নেমে অন্ধকারে মিশে গেছে।

ইথান কান পেতে শোনার চেষ্টা করল নিচে আটকে পড়া কোনো কুকুরের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় কি না। একটা আবেগহীন স্তব্ধতা যেন নিচ থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। পাশে দাঁড়ানো সহকর্মী ম্যাসন রিড তার পিঠে একটা ছোট্ট চাপ দিয়ে বলল, ‘লেটস গেট ডাউন, ইথান।’

ইথান ল্যাডার বেয়ে নামতে শুরু করল। তার গায়ে ভারী ফ্লোরেসেন্ট পোশাক। কোমরে একটা ওয়াকিটকি। কাঁধে একটা দড়ির ব্যাগ।

পঞ্চাশ ফুট নামার পর প্রথম সে ওপরে তাকাল। অনেক ওপরে কুয়ার গোল মুখে দুটি মানুষের মুখ। একজন সহকর্মী ম্যাসন রিড। আরেকটা মুখ ম্যাকঅ্যালিস্টারদের ছোট ছেলে এলির। তারই এ রকম উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকার কথা। কুকুরটা তারই। একটা ছোট্ট লোমশ জ্যাক রাসেল টেরিয়ার। নাম পিপ। ইথান ছবি দেখেছে পিপের। এলি দেখিয়েছে। এই কুকুর কী করে কুয়ার মধ্যে পড়ল, তা–ও বহু শতাব্দীর পরিত্যক্ত একটি কুয়ায়, সে–ও এক রহস্য। হয়তো কোনো খরগোশকে তাড়া করছিল। বা নিজে শিয়ালের তাড়া খেয়েছে। টেরিয়ারগুলো বোকা হয়।

অরিগনের ছোট্ট শহর জোসেফের বাইরে ম্যাকঅ্যালিস্টারদের এই পুরোনো খামারবাড়িতে ঝোপঝাড়ের আড়ালে যে একটা প্রাচীন কুয়া আছে, এটা ওই পরিবারের লোকেরাই ভুলে গেছে।

কুকুরটা কি এখনো বেঁচে আছে? একেবারে তলায় গিয়ে পড়েছে, নাকি পাথুরে দেয়ালের কোনো খাঁজে আটকে আছে?

ইথান আরও নেমে গেল। ল্যাডার অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন সে রশিতে ঝুলে নামছে। নামতে কষ্ট হচ্ছে না। মফস্‌সল শহর জোসেফে সে তিন তারকা উদ্ধারকর্মী। তার চেয়ে ভালো শারীরিক সামর্থ্য আর কারও নাই।

একটা আওয়াজ আসছে নিচের অন্ধকার থেকে, খুবই অস্পষ্ট। কুকুরের আওয়াজ কি? ভালো করে শোনার জন্য কোমরের ওয়াকিটকিটা বন্ধ করে দিল ইথান। সেটার খড়খড় আওয়াজ বন্ধ হলে একটা গা-ছমছম নীরবতা নেমে এল অন্ধকারে। তাতে কান পাতল সে। খুব মৃদু একটা আওয়াজ। কিন্তু কোনো কুকুরের কুঁইকুঁই না। একটা ধাতব আওয়াজ। ঠং ঠং ঠং। আর সেটা একটু একটু করে বাড়ছে। একটা ধাতব কিছু যেন ঠোক্কর খেতে খেতে অতল অন্ধকার থেকে উঠে আসছে তার দিকে। কোনো ধাতব জন্তু কি?

আওয়াজটা আরও বাড়ল। ধাতব জন্তুটা অন্ধকারে ছুটে আসছে তার দিকে। ইথান এলইডির আলো ফেলে তাকিয়ে থাকল নিচের হাঁ-মুখ অন্ধকারের দিকে। তার হাত কাঁপছে।

শেষ মুহূর্তে অন্ধকারের অতল থেকে লাফিয়ে উঠে এল যে জিনিসটা, সেটা ছোট বিড়াল আকৃতির একটা ধবধবে সাদা কিছু। আর তার ধাতব গায়ে ঠিকরে পড়ল ইথানের এলইডির আলো।

স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ায় বাঁ হাতে খপ করে জিনিসটা ধরে ফেলল ইথান। চোখের সামনে সেটা এনে সে বিস্মিত হলো। তার হাতে ধরা একটা পুরোনো আমলের তিন ব্যাটারির অ্যালুমিনিয়ামের টর্চ।