• প্রধান বাধা কাঁঠালের আঠা
  • দা-বঁটি দিয়ে চলছে প্রক্রিয়াজাতকরণ
  • আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে প্রয়োজন ফ্রিজ ড্রাইং
  • উৎপাদন বাড়লেও কমছে রপ্তানি

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। উৎপাদনে বিশ্বে অবস্থান দ্বিতীয়। বিপুল ফলন ও অপার সম্ভাবনার পরও ফলটির রপ্তানি হতাশাব্যঞ্জক। প্রক্রিয়াজাতকরণেও ঢের পিছিয়ে। কাঁঠালের আঠা ও প্রযুক্তিগত সংকটে থমকে যাচ্ছে সব সম্ভাবনা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ‘মাংসের বদলে কাঁঠাল খাওয়ার’ পরামর্শ কিংবা বর্তমান বিএনপি সরকারের কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের কাঁঠাল থেকে ‘শিঙাড়া-সমুচা ও কাবাবসহ বিভিন্ন ফুড প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে’ এমন বক্তব্য ব্যাপক আলোচনায় এলেও ফলটির প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো গতি নেই।

ব্যক্তিপর্যায়ে কাঁঠাল উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত। ব্যাপক সম্ভাবনাময় এ ফলটির প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা এখনো বৃহৎ শিল্পভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রত্যাশিত গতি আনতে পারেনি।

আঠার ফাঁদে আটকা কাঁঠালের সম্ভাবনাকাঁঠাল প্রসেস করছেন নারীরা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রধান বাধা কাঁঠালের আঠা। আঠামুক্ত কাঁঠালের জাত দেশে এখনো সেভাবে প্রসার ঘটেনি। কোন কাঁঠালের রং, স্বাদ ও কোয়ার বৈশিষ্ট্য কী হবে- সেটি এখনো জানা যায় না।

দেশের কাঁঠালের বাগানগুলোও একক জাতভিত্তিক নয়। ফলে কাঁচা কিংবা পেকে যাওয়া কাঁঠাল কেমন হবে তার নিশ্চয়তা মেলে না। এর বাইরে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, সংরক্ষণ সুবিধার ঘাটতি, পরিকল্পিত বাগান ও কাঁচামালের সংকট, উন্নত জাতের চারার স্বল্পতা, বাজার ও ভোক্তা সচেতনতার অভাব, সমন্বিত কারিগরি সহায়তার অভাব ও কাঁঠালের আঠা দূর করার প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে দেশে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণে গতি আসছে না।

বর্তমানে কাঁঠাল থেকে আমরা চিপস, ফ্রেশ-কাট কাঁঠাল, কাঁঠালের আচার, কাঁঠালের জ্যাম ও কাঁঠালের বিচির পাউডার তৈরি করছি। তবে এসব পণ্য উৎপাদনে আমরা কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারছি না।-হাজেরা অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়া

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে ভারত। দেশটিতে প্রতিবছর কাঁঠালের উৎপাদন হয় ২০ লাখ মেট্রিক টন। আর বাংলাদেশে কাঁঠালের উৎপাদন প্রায় ১৯ লাখ টন ছুঁইছুঁই। তবে দেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানি হচ্ছে মাত্র এক থেকে দুই হাজার টনের কিছুটা বেশি।

আরও পড়ুন

কাঁঠালের কলমে ফল মিলবে সাড়ে ৩ বছরেই

এমনকি যেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২৩১ টন কাঁঠাল রপ্তানি হয়েছিল, সেখানে তা কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ হাজার ২০৩ টনে নেমে এসেছে। আর সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁঠাল রপ্তানির পরিমাণ ছিল আরও কম, ওই অর্থবছরে দেশ থেকে মাত্র ১ হাজার ৮৩ টন কাঁঠাল রপ্তানি হয়।

প্রধান বাধা কাঁঠালের আঠা

দেশে কাঁঠাল থেকে কাঁঠালের জ্যাম, আচার, চাটনি, চিপস, কাটলেট, আইসক্রিম, কাঁঠালসত্ত্ব, রেডি টু কুক কাঁঠাল, ফ্রেশ কাট (ভেজিটেবল মিট), কাঁঠালের পাউডারসহ বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত পণ্য তৈরি হয়। তবে এসব পণ্য জনগণের কাছে ততটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

আঠার ফাঁদে আটকা কাঁঠালের সম্ভাবনাকাঁঠাল প্রসেস করছেন একজন নারী

হাতেগোনা কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণে কাজ করেন। দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করেন হাজেরা অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আড়ৎ অ্যাগ্রো বিডির কর্ণধার মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়া। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কাঁঠাল থেকে আমরা চিপস, ফ্রেশ-কাট কাঁঠাল, কাঁঠালের আচার, কাঁঠালের জ্যাম ও কাঁঠালের বিচির পাউডার তৈরি করছি। তবে এসব পণ্য উৎপাদনে আমরা কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারছি না।’

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দা, বঁটি ও কুড়ালের মতো প্রচলিত সরঞ্জাম ব্যবহার করে কাঁঠাল কেটে, আঠা সরিয়ে ও প্রক্রিয়াজাত করে চিপসসহ অন্য পণ্য তৈরি করছেন বলে জানান তিনি।

‘অথচ উন্নত দেশগুলোতে কাঁচা কাঁঠাল ধোয়া, কাটা, আকার নির্ধারণ ও প্যাকেজিংয়ের পুরো প্রক্রিয়াই স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়’, বলছিলেন এই উদ্যোক্তা।

দেশে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর আঠা বা গাম। কাঁঠালের আঠা দূর করতে পারলে এটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে বলে জানান কাঞ্চন।

এছাড়া কাঁঠাল দ্রুত পেকে যাওয়ায় সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সময়ও খুব সীমিত থাকে বলে দাবি করেন তিনি।

দেশীয় কাঁঠালের জাতগত সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরে কাঞ্চন মিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশে অধিকাংশ কাঁঠাল পুরোনো গাছের, যেখানে একেকটি গাছের ফলের স্বাদ, মিষ্টতা, রং ও কোয়ার গঠন একেক রকম। ফলে ক্রেতাকে নির্দিষ্ট মানের নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন হয়।’

আমাদের দেশের কাঁঠাল অত্যন্ত রসালো। এতে পানির পরিমাণ বেশি। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুকিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা কঠিন।-ড. মেহেদী মাসুদ 

থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারতের কেরালায় গামলেস এবং নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের জাতভিত্তিক কাঁঠালের বাগান গড়ে উঠেছে জানিয়ে বলেন, ‘তারা আগেই বলতে পারে ফলের রং, স্বাদ ও গুণগত বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিয়েছে।’

আরও পড়ুন

কাঁঠালের পিঠার রেসিপি

‘বাংলাদেশে কাঁঠালভিত্তিক বড় শিল্প গড়ে তুলতে হলে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় মেশিনারি, মানসম্মত জাতের সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। তা না হলে সম্ভাবনাময় এ খাতের আন্তর্জাতিক বাজার পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না’, বলেন কাঞ্চন।

আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে প্রয়োজন ফ্রিজ ড্রাইং

ফল বিশেষজ্ঞ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের কাঁঠাল অত্যন্ত রসালো। এতে পানির পরিমাণ বেশি। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে শুকিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা কঠিন।’

বর্তমানে আমরা মূলত সান ড্রাইং ও ওভেন ড্রাইং প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানান তিনি।

কাঁঠাল প্রসেস করছেন নারীরাকাঁঠাল প্রসেস করছেন নারীরা

ড. মেহেদী বলেন, ‘কাঁঠালকে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করতে হলে ফ্রিজ ড্রাইং প্রযুক্তি প্রয়োজন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলের পুষ্টিগুণ, রং ও গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে শুধু পানির অংশ অপসারণ করা যায়। এতে কাঁঠালের চিপস, ডিহাইড্রেটেড কাঁঠালসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করা সম্ভব।’

কৃষি প্রকৌশল ও খাদ্য প্রযুক্তিবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে কাঁচা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ জনপ্রিয় না হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর তীব্র আঠালো কষ এবং শক্ত রাফ সারফেস, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খোসা ছাড়ানো ও স্লাইসিং করার যান্ত্রিকীকরণকে অত্যন্ত জটিল, শ্রমসাধ্য করে তোলে।-কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক ড. সুরজিৎ সরকার

‘থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে ফ্রিজ ড্রাইং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশেও এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে কাঁঠালের জন্য বড় রপ্তানি বাজার তৈরি হতে পারে’, বলেন ড. মেহেদী।

কাঁচা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণে যত বাধা

‘কৃষি প্রকৌশল ও খাদ্য প্রযুক্তিবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে কাঁচা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ জনপ্রিয় না হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর তীব্র আঠালো কষ এবং শক্ত রাফ সারফেস, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খোসা ছাড়ানো ও স্লাইসিং করার যান্ত্রিকীকরণকে অত্যন্ত জটিল, শ্রমসাধ্য করে তোলে’, জাগো নিউজকে বলেন কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক ড. সুরজিৎ সরকার।

কাঁচা কাঁঠাল কাটার পর এর ভেতরের এনজাইমের কারণে দ্রুত ‘এনজাইমেটিক ব্রাউনিং’ বা কালচে রং ধারণ করে, যা সঠিক ব্লাঞ্চিং ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ট্রিটমেন্টের অভাবের কারণে ক্যানিং বা ভ্যাকিউম প্যাকেজিংয়ে পণ্যের গুণগত মান ও বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব নষ্ট করে বলে মত এই কৃষি বিশেষজ্ঞের।

আরও পড়ুন

কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে বার্গারের পেটি বানাবেন যেভাবে

এছাড়া, মাংসের বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা কাঁঠালের ভালো চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশে মাঠ পর্যায়ে সারা বছর ধরে কাঁচা কাঁঠাল সংরক্ষণের জন্য কোল্ড-স্টোরেজ অবকাঠামো নেই বলে জানান তিনি।

প্রক্রিয়াজাতকরণের পর কাঁচা কাঁঠালের কোর, রাফ রিন্ড ও কষযুক্ত প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বর্জ্য অংশ থেকে পেকটিন বা সাইলেজ তৈরির মতো সেকেন্ডারি বায়ো-প্রসেস প্ল্যান্ট না থাকায় সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাণিজ্যিক টেকসইতা পায় না বলেও জানান ড. সুরজিৎ সরকার।

পরিকল্পিত বাগানের অভাব

কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব অন্যতম প্রধান বাধা বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী।

দেশে কাঁঠালের বিভিন্ন উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পিত বাগান এখনো গড়ে ওঠেনি।-ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কাঁঠালের চিপস, ডিহাইড্রেটেড বা শুকনো পণ্য তৈরির জন্য আধুনিক ড্রায়ার ও বিশেষ যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। একইভাবে কাঁঠালসত্ত্ব বা অন্য মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনেও ড্রায়ার এবং উন্নত প্যাকেজিং সুবিধার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশে এ ধরনের অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়।’

আঠার ফাঁদে আটকা কাঁঠালের সম্ভাবনাকাঁঠালের তৈরি বিভিন্ন পণ্য

সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়াজাত পণ্য দীর্ঘদিন ভালো রাখতে স্টোরেজ সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক উদ্যোক্তারই রেফ্রিজারেটর, ডিপ ফ্রিজ কিংবা কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা নেই। ফলে উৎপাদনের পর পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’

‘দেশে কাঁঠালের বিভিন্ন উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পিত বাগান এখনো গড়ে ওঠেনি,’ বলেন ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী।

আরও পড়ুন

কাঁঠালের কেক থেকে মাশরুমের মিষ্টি, ফল মেলায় দর্শনার্থীর ভিড়

অধিকাংশ কাঁঠাল বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা গাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে নির্দিষ্ট জাতের পর্যাপ্ত কাঁচামাল একসঙ্গে পাওয়া যায় না, যা শিল্পভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে বড় সমস্যার বলে জানান এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কাঁঠালের উন্নত বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করছে জানিয়ে ফেরদৌস বলেন, ‘বারি কাঁঠাল-৩ এর মতো সারা বছর ফলদানকারী জাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এসব জাতের চারার সহজলভ্যতা এখনো সীমিত। গবেষণা প্রতিষ্ঠান নতুন জাত উদ্ভাবন করলেও সেগুলো দ্রুত মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’

‘অনেকের ধারণা কাঁঠাল শুধু পাকা অবস্থায় খাওয়ার ফল। কিন্তু কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া কাঁঠাল থেকে আটা বা পাউডার তৈরি করে নুডলস, সুপ ও শিশুখাদ্যের মতো বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, জানান তিনি।

ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে আমরা বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি সহায়তা ও বাজারসংযোগ (মার্কেট লিংকেজ) সুবিধা দিয়ে আসছি। আম, কাঁঠাল, টমেটোসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হন।-হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের যুগ্ম পরিচালক (বিপণন) মিটুল কুমার সাহা 

কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কাঁঠালের আঠা দূর করা এখনো একটি বড় সমস্যা। গবেষণার মাধ্যমে এর সমাধান ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও বৃহৎ পরিসরে শিল্প পর্যায়ে প্রয়োগ এখনো সীমিত। এসব চ্যালেঞ্জ দূর করা গেলে কাঁঠালভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

সরকারি সহায়তার চিত্র

সরকারি সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের যুগ্ম পরিচালক (বিপণন) মিটুল কুমার সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে আমরা বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি সহায়তা ও বাজারসংযোগ (মার্কেট লিংকেজ) সুবিধা দিয়ে আসছি। আম, কাঁঠাল, টমেটোসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হন।’

আঠার ফাঁদে আটকা কাঁঠালের সম্ভাবনাকাঁঠালের তৈরি বিভিন্ন খাবার

আমাদের কার্যক্রমের আওতায় সীমিত পরিসরে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতিও সরবরাহ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে রয়েছে ফল শুকানোর (ড্রায়িং) জন্য ড্রায়ার মেশিন, কাঁঠালের চিপস তৈরির সরঞ্জাম, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ও ক্ষুদ্র প্যাকহাউজ স্থাপনের সহায়তা।’

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পভেদে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়ে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।-কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক (বাজার সংযোগ, গবেষণা, রপ্তানি উন্নয়ন ও কৃষি ব্যবসা শাখা) মোহাম্মদ মুনসুর আলম খান 

এসব প্যাকহাউজে ওয়াশিং, গ্রেডিং, সর্টিং, ড্রায়িং, প্যাকেজিং ও ওজন পরিমাপের সুবিধা রাখা হয়, যাতে কৃষক ও নারী উদ্যোক্তারা সেখানে বসেই প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক (বাজার সংযোগ, গবেষণা, রপ্তানি উন্নয়ন ও কৃষি ব্যবসা শাখা) মোহাম্মদ মুনসুর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পভেদে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়ে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।’

‘অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির মূল্যের একটি অংশ সরকার বহন করে ও বাকি অংশ উদ্যোক্তারা দেন। প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সব উদ্যোক্তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। তারপরও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যত বেশি সম্ভব উদ্যোক্তাকে সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

দেশে কাঁঠালের উৎপাদন ১৯ লাখ টন ছুঁইছুঁই

বিভিন্ন ফলের মতো দেশে কাঁঠালের উৎপাদনও বেড়েছে। বর্তমানে কাঁঠালের উৎপাদন ১৯ লাখ টন ছুঁইছুঁই। গাজীপুর ও টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল উৎপাদন হয়।

আরও পড়ুন

কাঁঠাল খেলে সারবে যেসব রোগ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৮ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমিতে ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছে।

কমছে কাঁঠাল রপ্তানি

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২৩১ টন কাঁঠাল রপ্তানি হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ২ হাজার ২৪ টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩ টনে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের ২১ জুন পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ২০৩ টন।

কাঁঠালের তৈরি বিভিন্ন পণ্য

বছরে প্রায় ১৯ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ এখনো কাঁঠালকে শিল্পপণ্যে রূপান্তর করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, আঠামুক্ত জাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো ও পরিকল্পিত বাগান গড়ে তোলা গেলে কাঁঠাল দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

ইএইচটি/এএসএ/এমএফএ