টানা ভারি বর্ষণ, পাহাড়ধস এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা আবারও মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। বৃহস্পতিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি নাজুক রূপ ধারণ করেছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়াসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানে পাহাড়ধসের কারণে শিশুসহ অনেকের প্রাণহানি ঘটেছে। বলা বাহুল্য, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে পাহাড়ধসের কারণে এমন ট্র্যাজেডি যেন এক অলঙ্ঘনীয় নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কতকাল আমরা মানুষের সীমাহীন লোভের বলি হওয়া অসহায় নাগরিকদের এই আহাজারি শুনব?

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে অতিবর্ষণ কিংবা উজান থেকে আসা ঢলের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ হয়তো সীমিত; কিন্তু পাহাড়ধসের মতো মানবসৃষ্ট ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিপর্যয় রোধে গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উল্লেখ্য, নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড় করা এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন গড়ে তোলার কারণেই মূলত বর্ষাকালে মাটির বাঁধন আলগা হয়ে ধসের ঘটনা ঘটে। আমরা মনে করি, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারির অভাব এবং একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের পাহাড় কাটার মহোৎসবই এই ট্র্যাজেডিকে বারবার ডেকে আনছে। এবারের দুর্যোগে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে রেল যোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়া, হাজার হাজার পর্যটকের সাজেক ও থানচিতে আটকে পড়া এবং লাখো মানুষের পানিবন্দি দশা আমাদের সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

এই স্থায়ী সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের প্রচলিত ও সাময়িক পন্থার বাইরে এসে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অবলম্বন করতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া জরুরি। পরিবেশ আইন অমান্য করে যারা পাহাড় কাটে কিংবা প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি। একইসঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবকে প্রশ্রয় না দিয়ে এই পাহাড়খেকোদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, বন উজাড়ের কারণে পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হওয়ায় ধসপ্রবণ পাহাড়গুলোতে ব্যাপকভাবে গভীরমূলী বৃক্ষরোপণ এবং বনায়ন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে, যা মাটির ক্ষয় রোধে ঢাল হিসাবে কাজ করবে।

সেই সঙ্গে আমাদের সামগ্রিক দুর্যোগ পূর্বাভাস ও উদ্ধার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করাও প্রয়োজন। এছাড়া মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে জোর দিতে হবে। ভারতের উজান থেকে আসা ঢল সামাল দিতে নদীগুলোর নাব্য বৃদ্ধি এবং ড্রেজিং কার্যক্রম যেমন জরুরি, তেমনি চট্টগ্রাম ও অন্যান্য নগরে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে খাল ও নালাগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করাও বাধ্যতামূলক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এমন করুণ প্রভাব রোধে প্রশাসন, পরিবেশবাদী ও স্থানীয় জনগণ একযোগে কাজ করবে, এটাই প্রত্যাশা।