প্রথম শ্রেণির পৌরসভা মাগুরা। বছরের পর বছর নিয়মিত কর ও ভ্যাট পরিশোধ করছেন বাসিন্দারা। কিন্তু শহরের রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর সড়ক বাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর তৈরি হয় ভুতুড়ে পরিবেশ। এতে ক্ষুব্ধ পৌরবাসী।
পৌরবাসীর অভিযোগ, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা থাকলেও উন্নয়নের সূচকে মাগুরা এখনো অনেক পিছিয়ে। নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে বাসিন্দারা বৈষম্যের শিকার বলে মনে করছেন। তাঁদের প্রশ্ন, কর আদায় অব্যাহত থাকলেও নাগরিক সেবার মান কেন উন্নত হচ্ছে না?
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আক্কার হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর নিয়ম মেনে কর ও ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু বিনিময়ে পাচ্ছি শুধু অবহেলা আর দুর্ভোগ। রাস্তাঘাটের যে দশা, তাতে এখন চলাই দায়।’
শহরের প্রাণকেন্দ্র ভায়নার মোড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন আবাসিক এলাকার চিত্র সন্ধ্যার পর সম্পূর্ণ বদলে যায়। ভায়নার মোড় থেকে যশোর রোড ভিটাশাইর পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কটিতে পৌরসভার কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই। ঢাকা-ঝিনাইদহ মহাসড়কের সংযোগ সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো রাতে ঘোর অন্ধকারে ডুবে থাকে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রধান সড়কেই যদি আলো না থাকে, তবে মানুষ নিরাপদে চলবে কীভাবে? এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এলাকায় ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
নিজনান্দুয়ালী এলাকার বাসিন্দা খাদিজা খাতুন বলেন, সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। রাস্তায় পর্যাপ্ত বাতি নেই। নারী ও শিশুদের নিয়ে চলাফেরা করতে আতঙ্ক কাজ করে। বারবার অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাইনি।
সরেজমিনে শহরের কলেজপাড়া, আদর্শপাড়া, স্টুডিওপাড়া, ভায়না টিটিসিপাড়া, নিজনান্দুয়ালী, পারনান্দুয়ালী, সাতদোহা, সীতারামপুর, কুকনা, পুলিশলাইন, পাথরা, দোয়ারপাড়া, বাঁশতলা হাজীরোড ও নতুন বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র। অপরিকল্পিত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাগুলো যেন ছোটখাটো নদীতে পরিণত হয়। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় দিনের পর দিন নোংরা পানি জমে থাকে। যা শিশু ও বৃদ্ধদের যাতায়াত স্থবির করে দিয়েছে।
একজন ইজিবাইকচালক আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। খানাখন্দের কারণে প্রায়ই যাত্রীসহ গাড়ি উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। রাস্তাগুলোর পিচ-খোয়া উঠে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
কলেজপাড়ার বাসিন্দা সোহান খান বলেন, রাস্তাঘাটের অবস্থা এতই খারাপ যে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি নামার কোনো পথ নেই বা ভোগান্তির শেষ নেই।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও রাস্তার পাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম না থাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।
পৌরবাসীর দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাগুরা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বারী বলেন, ‘একটি বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মাগুরা পৌরসভার সার্বিক রূপান্তরের জন্য প্রায় ৫২২ কোটি টাকার একটি বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বাজেট অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়াটি চলমান। তহবিল পেলেই পুরো পৌরসভার উন্নয়নকাজ পুরোদমে শুরু করা সম্ভব হবে।’
সম্মিলিত নাগরিক সমাজ মাগুরার প্রতিনিতি মো. আমিনুল ইসলাম শেলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সমস্যাগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না, যার কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে। পৌরসভার এই সেবাবঞ্চিত নাগরিকেরা এখন ক্ষোভে ফুঁসছেন।
সম্মিলিত নাগরিক সমাজ মাগুরার সাধারণ সম্পাদক শরীফ মিজানুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভাঙাচোরা রাস্তা সাধারণ মানুষের চলাফেরায় এখন বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’








