আশা জাগানিয়া ইতিবোধের সবুজ দ্বীপের প্রত্যাশায় থেকে আমরা নিয়ত ক্লান্ত হয়ে পড়ি| অমল আলোয় মানবিকতার সুবাতাসের শিহরন নেই মানুষের জীবনে| কালের পরিক্রমায় তত্ত্বের পাহাড় দাঁড় করিয়েছে মানুষের সভ্যতা| মানুষের জীবন সুরাষ্টের নাগরিক হওয়ার সচ্ছলতা পাবে;— এ নিয়ে দৈশিক ও বৈশ্বিক পরিধিতে কত-না সংঘ! কিন্তু পরিণামে এইসব সংঘ সুবোধ নাগরিকদের পীড়নযন্ত্রে আটকে রেখেছে| ক্ষমতাধরদের আধিপত্যের জেদ আর পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্যে সরল নাগরিকেরা সভ্যতার নেমিচক্রে রক্তাক্ত হয়ে নিরন্তর আর্তনাদ করছে| আতিয়া ইসলাম এ্যানির শিল্পকর্ম পাঠ করলে দর্শক মূলত নেতিপীড়িত কালের বিচিত্র ধ্বস্ত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবেন| ধর্মের উগ্র-চর্চা, অর্থের লোলুপতা— এই সূত্রে বিচিত্র সন্ত্রাস, পুরুষের কামার্ত চোখের চুম্বক আবেশে বন্দী নারী, যৌবন-যৌনতার বিজ্ঞাপনের কেন্দ্রে নারী— এর সবই স্পষ্ট ইমেজে দৃশ্যমান এ্যানির ক্যানভাসে|উজ্জ্বল রঙে স্পষ্ট জ্যামিতিতে আঁকা ছবির সমস্ত অনুষঙ্গ| তবুও নিবিষ্ট দৃষ্টিপাত ছাড়া এ্যানির বক্তব্য অনুধাবন করা যায় না| সম্প্রতি শিল্পী লোকান্তরিত হয়েছেন| এজন্য তার পূর্বাপর কাজের মূল্যায়নের তাগিদ অনুভূত হচ্ছে| এ্যানির প্রথম প্রদর্শনী হয় ২০০০ সালে| ২০০৯-এ দ্বিতীয় এবং সবশেষ আয়োজন ২০২৩-এ| চিত্রের করণ কৌশল আয়ত্বে অপূর্ব দক্ষতা অর্জিত হলেও এই শিল্পী দুই-তিন বছর পর পর প্রদর্শনী করেননি| বক্তব্য পুষ্ট শিল্প সৃষ্টির জন্য বিষয়কে নিয়ে দীর্ঘ ভাবনার প্রয়োজন হয়| এ কারণেই হয়তো এ্যানি দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তিনটি প্রদর্শনী করেছেন| প্রথম প্রদর্শনীতে এ্যানি নিষ্ঠুরতার বয়ান ডাগর ভাষায় প্রকাশ করেননি| প্রথম পর্বের আয়োজনে ছিল কৌতুক রসের আধিক্য| তবে তাতে কোনো সুখদোলার অনুভব ছিল না; বড় হয়ে উঠেছিল পরিহাসময়তা| ইতি-নেতির একটা বিভ্রম সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল তার| এ পর্বের ছবিতে আমরা দেখতে পাই আয়নায় নিজেকে দেখে মানুষ নিজেই নিজের মনোভঙ্গির বিচিত্র অভিব্যক্তি পরখ করছে| এভাবে মানুষ নিজেকে নিজে যাচাই করে| অবয়ব নানা বোধের অভিঘাতে রূপান্তরিত করার খেয়ালটাই বিশেষ দ্রষ্টব্য ছিল তার| মূল ও প্রতিফলিত— এই দুই ইমেজের বিরোধাভাসের মধ্যে শিল্পী নিজেও উপস্থিত— সঙ্গত কারণেই এ ভাবনা দর্শকের মনে আসে| অন্য এক সূত্রানুসারে এমন ভাবাও অসঙ্গতা নয় যে, সময়টা যেহেতু সহজ পাঠ্য নয়, তাই কে কার হাতের ক্রীড়নক তা বোঝা যাচ্ছে না| কখনো হাস্যরস, কখনো-বা কৌতুকের পাশাপাশি ভয়াল চিৎকৃত মুখের উপস্থিতিতে আতঙ্ক-আবেশ ˆতরি হতো ছবির পটভূমে| শিল্পী এ্যানি তার ˆশল্পিক জীবনটার পরিচয় তুলে ধরতে চেয়েছেন| তাই তার ছবিতে তুলি, কলম, প্যালেট, ক্যানভাস, ফ্রেম এগুলোও হয়েছে অপরিহার্য অনুসর্গ| শিল্পীর অনিষ্ট ছিল সুন্দরের পরিহাসময় উপস্থাপন এবং পরিচিত সুন্দরের মূর্তি স্বকালের বেদনার অভিঘাতে চূর্ণ করা| বস্তুত ব্যাখ্যাতীত পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য তার কাজে ক্রিয়াশীল এই বিচূর্ণীভবন| বিবেকবোধের তাড়নায় এক উজানী টানে তিনি শিল্পের নয়ন সুখকর ইমেজে এনেছেন তামাশার বয়ান| তাই তিনি আঁকেন দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার চিৎকৃত রূপ| যে-শিল্পী নিজের সময়ের আর্তনাদ শোনেন, তার কাছে প্রচল সুন্দর অসার ও অর্থহীন হয়ে পড়ে| তাই এ্যানির কাছে অর্ধসহস্রাব্দ ধরে প্রতিষ্ঠিত মোনালিসা নামক নারীমুখ বিলাসব্যাসন বলে মনে হয়| সুন্দরের বাণিজ্যের অন্তরালেও রয়েছে কুটিল রাজনীতি| সুন্দর ইমেজের বিনির্মাণ এ্যানির প্রধান প্রবণতা| অবশ্য শিল্পীর প্রধান থিম সুন্দর ও অসুন্দরের সহবস্থানের শৈল্পিক বিরোধাভাস তৈরি করা| সৃজনের ঘোরে নিজ অস্তিত্বের অসহ প্রদাহের বিবরণ দিতে গিয়ে এ্যানি ফ্রান্সিস বেকনের দ্বারস্থ হয়েছেন| এই আইরিস শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতির এক্সপ্রেশনিস্ট ইমেজ এ্যানি সংযুক্ত করেছেন তার ছবির অংশ হিসেবে| বেকন একটা সিগন্যালের মতো কাজ করেছেন তার সৃজনী-সত্তায়| তবে পরিণত পর্বে এ্যানি আর কোনো শিল্পীর প্রচ্ছায়ায় নিজেকে দাঁড় করাননি|স্বদেশের রাজনীতির স্রোত কেবলই আবিল হয়| নরমুণ্ড ও ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিচ্ছিন্ন অংশ রক্তের লালে বিবৃত করেছেন এ্যানি| এসব ছবির দিকে তাকালে মনে হয় এইমাত্র ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড দেখছি আমরা| তার ছবি হয়ে উঠেছে সময়ের সচল সম্প্রচারের মতো পরিবেশন|শিল্পীর স্পেসে পৌনঃপুনিকভাবে উপস্থাপিত কামার্ত পুরুষ, পুতুলের মতো সুন্দর নারী দেহ, হিজাবপরিহিত নারীর চোরাগুপ্তা চাহনি— যাতে আকাঙ্ক্ষা ও অবদমনের যুগলাভাস| এইসব নারী কখনো একান্তভাবে অবরোধবাসিনী| তাদের আকাঙ্ক্ষা পুরুষ শাসিত সমাজে অবরুদ্ধ কুঠুরিতে বন্দি| শিল্পী এ্যানি নারীবাদী চৈতন্যের দ্রোহে সুকৌশলে সমাজে নারীর অবস্থান প্রতিপন্ন করেন|তবে শুধু নারীর যাতনার বিবৃতিতে তুষ্ট নয় শিল্পী| সমাজকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেন আয়ত অবলোকনে| সৃষ্টির তাগিদে একক কোনো বোধ ও চিন্তায় কেন্দ্রস্থ থাকা সম্ভব নয়| লোভ ও আধিপত্যের শিকার মানবতা| চতুর্দিকে বিচিত্র অস্ত্রের সন্ত্রাস| নীল-সবুজের ওপর কেবলই রক্তপাত| এমনকি যুদ্ধাস্ত্রে আক্রান্ত হয় সাধারণের অমল রাজনীতির সমাবেশ| ক্ষমতার পালাবদল হয়, পালাবদল হয় সন্ত্রাসেরও; মানুষের লোভ ও আধিপত্যের নিষ্ঠুর আয়োজন হয় আরও অভিনব| ঈশ্বরপ্রতীম শক্তির কাছে সাধারণ মানুষ খেলার পুতুল| এ্যানির ছবিতে জাদুকরের হাত-সাফাইয়ের মতো করে মানুষের হাতের উপস্থাপন রয়েছে| এছাড়া পুতুল খেলার মতো করেও উপস্থাপিত হয়েছে মানুষ| পুতুল নাচের খেলুড়ের হাতে ধরা আছে সুতোগুলো| সে-ই নাচাচ্ছে মানুষকে| মানুষ এমনই অসহায়! এই সত্য আমরা বারবার দেখতে পাই শিল্পীর ছবিতে| বার্বি ডলের মতো পুতুলের ইমেজ বর্ণের উজ্জ্বল জৌলুসে প্রকাশ করেছেন শিল্পী| ছবির দিকে তাকালে মনে হয় এসব চিত্র পপ আর্টের আদর্শের অনুসারী| শিল্পী প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল রঙে সত্যের সম্প্রচার প্রয়াসী|
স্পষ্ট রেখার ড্রইং আর অত্যুজ্জ্বল রঙের নির্ভরতায় এ্যানি উপস্থাপন করেছেন গ্রেনেড, রাইফেল, ছুরি, কাঁচি; আরো আছে হাসপাতালের বিছানা, ঔষধ, আপেল, কলা, বোতলজাত পানিসহ আরও চিকিৎসা সম্পর্কিত বিষয়াদি| এসব বিষয় অনুপুঙ্খ পাঠে একনিষ্ঠ দর্শক সহজেই এই উপলব্ধিতে উপনীত হবেন যে, স্বদেশ ও স্বদেশের মতো আরো অনেক দেশ ও দেশের মানুষ মুমূর্ষু রোগী হয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে| এই নিষ্ঠুর ঘটমান বর্তমান শিল্পের সত্যের জোরে হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে চিত্রগত স্পেসে| শিল্পী এ্যানি যেন চিন্তাগর্ভ অনুভবে তার জগত সংসারের অভিজ্ঞতা-সম্বলিত আত্মজীবনী লেখা সমাপ্ত করেই লোকান্তরিত হলেন|








