মাত্র ছয় বছর আগের কথা। তাদের নামে ছিল হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে মামলা। দিনের পর দিন কেটেছে আত্মগোপনে। কেউ কেউ কাটিয়েছেন দীর্ঘ কারাজীবন। আজ সেসব মানুষের আত্মপরিচয় বদলে গেছে। কেউ মাছচাষি, কেউ গরুর খামারি, কেউ আবার নিরেট কৃষক। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একজোট হয়ে তারা উজ্জ্বল আগামীর অন্বেষণে নেমেছেন। আত্মসমর্পণের পর রাজশাহীর ৫৪ জন সাবেক চরমপন্থির এই বদলে যাওয়া জীবনের গল্পের নাম ‘রাজশাহী স্বপ্নচাষ সমন্বিত কৃষি সমবায় সমিতি লিমিটেড।’
পাবনায় ২০১৯ সালে রাজশাহীসহ দেশের ১৪টি জেলার কয়েকশ বাম চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করেন। বিভিন্ন চরমপন্থি সংগঠনের সদস্যরা তাদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন। আর এ আত্মসমর্পণই ছিল একটি নতুন জীবনের সূচনা। দেশের উত্তরাঞ্চলের চরম বামপন্থি আন্দোলনের ইতিহাস অর্ধশতাব্দীরও বেশি। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই আদর্শিক আন্দোলনের বড় একটি অংশ সশস্ত্র সংঘাত, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে।
ফলে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। আর আত্মগোপনের জীবন হয়ে ওঠে অনেকের নিয়তি। পরে সরকারের পুনর্বাসন উদ্যোগ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি অনেক চরমপন্থি সদস্যকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে কর্মময় জীবনের পথে ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।
এই আত্মসমর্পণ কর্মসূচির পেছনে রাজশাহী অঞ্চলের সদস্যদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আব্দুর রাজ্জাক সরকার। তিনি আর্ট বাবু নামে পরিচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী একসময় সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে চরম বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
দীর্ঘ সংঘাতময় জীবন পার করে অবশেষে আর্ট বাবু উপলব্ধি করেন-অস্ত্র নয়, উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব। পাশাপাশি সমাজের মূলধারায় কার্যকর অবদান রাখার মধ্যেই রয়েছে স্থায়ী পরিবর্তনের পথ। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি রাজশাহী অঞ্চলের আত্মগোপনে থাকা সদস্যদের আত্মসমর্পণে উদ্বুদ্ধ করেন। পুনর্বাসন উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন।
চরমপন্থি সদস্যদের আত্মসমর্পণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তাদের কর্মসংস্থান। কারণ অস্ত্র জমা দেওয়ার পর জীবিকা নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন-সেই বাস্তবতা থেকেই রাজশাহীর আত্মসমর্পণকারী ৫৪ জন সাবেক চরমপন্থি সদস্যকে নিয়ে ‘স্বপ্ন দেখি-স্বপ্ন জয়ের’ স্লোগানকে সামনে রেখে গড়ে তোলা হয় ‘রাজশাহী স্বপ্নচাষ সমন্বিত কৃষি সমবায় সমিতি লিমিটেড।’
সমিতির বর্তমান সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজীউর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সরকার ওরফে আর্ট বাবু। তাদের নেতৃত্বে আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক নানাবিধ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আত্মসমর্পণকারী রাজশাহীর সদস্যদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারিভাবে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে এই প্রকল্পের আওতায় রাজশাহীতে দুটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা হয়। প্রথম খামার প্রকল্পটি বাগমারা উপজেলার বনগ্রামে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সেখানে ১৩ বিঘা জমি কিনে পুকুর খনন, মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন এবং বনজ, ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা হয়েছে। দ্বিতীয় খামার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে তানোর উপজেলায়। সেখানেও মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন এবং কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিমূলক বিভিন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
বর্তমানে সমবায় সমিতির সদস্যরা মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন ও কৃষিকাজের দ্বারা সরকারের আওতাধীন প্রকল্প দুটির মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। তারা সবাই নিজ নিজ পরিবার নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনযাপন করছেন। সমিতির কার্যক্রম চালানো ছাড়াও নিজেদের পৈতৃক জমিজমা চাষাবাদ করে যে আয় হচ্ছে তা সংসারে ব্যয় করছেন তারা।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আর্ট বাবু বলেন, ‘আমরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিতে এসে বিপথগামী হয়েছিলাম। সেই পথ মানুষের কল্যাণ বয়ে আনেনি। কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন জয় করার জন্য। আমাদের বিশ্বাস, উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান ও সামাজিক সৌহার্দ-সম্প্রীতির মাধ্যমেই সমাজকে পরিবর্তন করা সম্ভব। আমরা চাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর কেউ যেন বিপথগামী না হন।’ সমিতির কোষাধ্যক্ষ নওশাদ আলী স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। দীর্ঘ ১৪ বছর কারাভোগের পর তিনি আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনের মূলস্রোতে ফিরেছেন। বর্তমানে তিনি সমিতির সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করছেন। নওশাদ বলেন, ‘জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পেছনে ফেলে এসেছি। আমরা এখন কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের জন্য নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধ। সমাজ ও সরকার আমাদের সুযোগ দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো, সেই আস্থার প্রতি সম্মান জানানো। সন্ত্রাস নয়, বরং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডই প্রকৃত শক্তি।’
সমিতির কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা জানান, সদস্যদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবছর দুই ঈদে উৎসব ভাতা দেওয়া হয়। অসুস্থ সদস্যদের চিকিৎসা এবং পারিবারিক সংকটসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে আর্থিক সহযোগিতা ও এককালীন অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। প্রতিবছর সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলা প্রশাসন, সমবায় বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন। সমিতির বর্তমান সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজীউর রহমান বলেন, ‘একসময় আমাদের হাতে অস্ত্র ছিল। ছিল ত্রাসের আতঙ্ক। কিন্তু সেখানে এখন কৃষিকাজের ব্যস্ততা। আত্মগোপনে থাকা সদস্যদের সন্তানরা এখন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছে। পরিবারগুলো ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিক-সামাজিক জীবন। এই পরিবর্তন শুধু ৫৪ জন মানুষের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্যই একটি ইতিবাচক বার্তা।’








