আমাদের চারপাশের সমাজটাকে যদি একটা আয়নার সামনে দাঁড় করানো যায়, তবে কেমন দেখাবে? সেখানে কি কেবল আমাদের পরিপাটি চেহারাটাই ফুটে উঠবে, নাকি মুখোশের আড়ালে থাকা অন্ধকার দিকগুলোও বেরিয়ে আসবে? প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদের লেখা ‘আয়না’ বইটি ঠিক এমনই একটি আয়না, যা সমাজের ভণ্ডামি ও অন্ধবিশ্বাসের আসল রূপটি পাঠকের সামনে তুলে ধরে।
আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ। আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত ‘আয়না’ মূলত একটি ব্যঙ্গগল্পের সংকলন। গল্পগুলোর পরতে পরতে তিনি সমসাময়িক ধর্মব্যবসা, সাম্প্রদায়িকতা ও মেকি রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। লেখকের নিজ চোখে দেখা সমাজের নানা অসংগতি এই বইয়ের মূল উপজীব্য।
বইটির মূল থিম হলো সামাজিক ও ধর্মীয় ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন। এখানে মোট সাতটি গল্প স্থান পেয়েছে। গল্পগুলো হলো—‘হুজুর কেবলা’, ‘গো-দেওতা কা দেশ’, ‘নায়েবে নবী’, ‘লিভরে-কওম’, ‘মুজাহেদিন’, ‘বিদ্রোহী সংঘ’ এবং ‘ধর্ম-রাজ্য’। ধর্মের নামে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির লোক কীভাবে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে, তা গল্পগুলোতে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। ‘হুজুর কেবলা’ গল্পে দেখা যায়, এক পীর সাহেব আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে তার এক মুরিদের স্ত্রীকে বিয়ে করার ফন্দি আঁটেন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক এমদাদ অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে পীরের কাছে গেলেও শেষে পীরের এই ভণ্ডামি ধরতে পারেন। আবার ‘নায়েবে নবী’ গল্পে মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়ার সময় দুই মৌলভির ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সমাজের চরম হাস্যকর অথচ বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। মৃতদেহ সামনে রেখে তাদের এই হাতাহাতি প্রমাণ করে ধর্মের চেয়ে তাদের কাছে ব্যক্তিগত অহংকারই বড়।
আরও পড়ুনবই আলোচনা / আয়না: তীব্র ও ঝাঁঝালো জীবনবোধ
আবুল মনসুর আহমদের লেখনী অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও তীক্ষ্ণ। তিনি তৎকালীন সমাজের কথ্য ভাষা এবং আরবি-ফারসি শব্দের এমন নিপুণ মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছে। তার রসবোধ ও তীর্যক মন্তব্য পাঠককে হাসায় এবং একই সাথে ভাবতে বাধ্য করে। ‘গো-দেওতা কা দেশ’ গল্পে গরুর দুধের বন্যায় দেশ ভেসে যাওয়ার যে রূপক তিনি ব্যবহার করেছেন, তা লেখকের অসামান্য কল্পনাশক্তি ও রসবোধের পরিচয় দেয়।
গল্পগুলোর নির্মাণশৈলী বেশ চমৎকার। প্রতিটি গল্পের শুরুতেই একটি আদর্শিক বা ধর্মীয় গাম্ভীর্যের আবহ তৈরি করা হয়, যা কাহিনির বিকাশের সাথে সাথে ভেঙে পড়ে এবং চরিত্রগুলোর আসল রূপ বেরিয়ে আসে। ‘লিভরে-কওম’ গল্পের ইসমাইল সাহেবের মতো চরিত্ররা ধর্ম ও রাজনীতির মিশেল দিয়ে কীভাবে সমাজে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়, তা অত্যন্ত বাস্তবানুগ। তিনি ‘আহলে-হাদিস-গুর্য’ পত্রিকার মাধ্যমে নিজেকে একজন নিঃস্বার্থ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি জবাবদিহিতা এড়িয়ে নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত থাকেন। মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজ কাঠামোর ওপর লেখকের যে গভীর পর্যবেক্ষণ ছিল, তা চরিত্রগুলোর আচরণের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘বিদ্রোহী সংঘ’ গল্পে ফাঁকা বুলিসর্বস্ব তথাকথিত বিপ্লবীদের পলায়নপর মনোবৃত্তি অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। পুলিশ আসার খবর শুনেই তাদের আদর্শ ভুলে প্রাচীর টপকে পালানোর দৃশ্যটি দারুণ হাস্যরস তৈরি করে।
‘মুজাহেদিন’ গল্পে হানাফী ও মোহাম্মদী সম্প্রদায়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের চিত্র দেখানো হয়েছে, তা মূলত সমাজের বিভেদের রাজনীতির দিকেই আঙুল তোলে। সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে কীভাবে ধর্মব্যবসায়ীরা ফায়দা লোটে, তা এই গল্পে স্পষ্ট। অন্যদিকে ‘ধর্ম-রাজ্য’ গল্পে মসজিদের সামনে বাদ্য বাজানো নিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের অন্ধ ধর্মান্ধতা কীভাবে উভয় সম্প্রদায়কে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, তার ভয়ংকর চিত্র আঁকা হয়েছে। ধর্মের নামে জেদ বজায় রাখতে গিয়ে উপবাসে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মৃত্যুর দৃশ্যটি চরম ধর্মান্ধতার অসারতাকেই প্রমাণ করে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / বনলতা সেন: রহস্যময় প্রেমের কবিতা
বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর নির্ভীকতা। লেখক কোনো রাখঢাক না করে সরাসরি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা কপটতাকে আঘাত করেছেন। সীমাবদ্ধতার কথা বলতে গেলে, বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের কাছে কিছু আরবি-ফারসি শব্দ ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুটা দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। তাছাড়া কিছু জায়গায় ব্যঙ্গের মাত্রা এতটাই তীক্ষ্ণ যে তা নির্দিষ্ট সংবেদনশীল পাঠকের কাছে অস্বস্তিকর লাগতে পারে। তবে গল্পের মূল বক্তব্য এতটাই শাশ্বত যে, এই ছোটখাটো বিষয়গুলো পাঠের আনন্দকে ম্লান করতে পারে না।
বইটি অনেক আগে লেখা হলেও এর প্রাসঙ্গিকতা আজও একটুও কমেনি। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক ভণ্ডামি আজও আমাদের সমাজে প্রকট। যারা সমাজকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চান এবং বুদ্ধিদীপ্ত রম্যরচনা ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি একটি অবশ্য পাঠ্য বই।
‘আয়না’ কেবল একটি গল্পের বই নয়, এটি আমাদের মনোজগতের নির্মম প্রতিচ্ছবি। সমাজের পচনশীল দিকগুলোকে হাসির মোড়কে তুলে ধরে লেখক আমাদের সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। ব্যঙ্গসাহিত্যের এই অমূল্য রত্নটি বাংলা সাহিত্যে আপন মহিমায় উজ্জ্বল। আবুল মনসুর আহমদের সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা বইটিকে একটি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা দিয়েছে। বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তার খোরাক হিসেবে বইটি আজও প্রতিটি সচেতন পাঠকের সংগ্রহে থাকা উচিত।
এসইউ








