মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু আবিষ্কার পৃথিবীকে আমূল বদলে দিয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক তার অন্যতম। একসময় নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, যক্ষ্মা কিংবা প্রসবজনিত সংক্রমণের মতো রোগ ছিল মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন এক বিপ্লব ঘটায়, যার ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছে।
আধুনিক অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন কিংবা নিবিড় পরিচর্যা—সবকিছুর পেছনেই কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অবদান রয়েছে। কিন্তু মানবজাতির এই মহামূল্যবান অর্জন আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখে। অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, আর বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্বীকার করেছেন যে দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। তাঁর এই বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক মন্তব্য নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব বিপদের সরকারি স্বীকৃতি। কারণ, এই সংকট এমন নয় যে হঠাৎ করে একটি মহামারির মতো দৃশ্যমান হবে। এটি ধীরে ধীরে চিকিৎসাব্যবস্থার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, সাধারণ রোগকে জটিল করে তোলে এবং একসময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যখন প্রচলিত ওষুধ আর কোনো কাজই করে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বিশ্বের শীর্ষ জনস্বাস্থ্য হুমকিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে অন্তত ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণের কারণে ঘটে। পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোর পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত জটিলতায়। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও হবে বিপুল, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে লড়াই মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার লড়াই। আজ আমরা যদি দায়িত্বহীনভাবে এই ওষুধ ব্যবহার করি, তাহলে আগামী দিনের চিকিৎসাব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এমন এক সময় আসতে পারে, যখন সাধারণ ক্ষত, নিউমোনিয়া কিংবা মূত্রনালির সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহু অর্জন তখন অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে এ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। দেশের অসংখ্য মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে সেবন করেন। সামান্য জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণেও অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। অথচ ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কার্যকারিতা নেই। তবু দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশায় কিংবা ওষুধ বিক্রেতার পরামর্শে মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে এসব ওষুধ গ্রহণ করছে।
সমস্যা আরও গভীর হয় যখন রোগীরা নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন করেন না। কয়েক দিন ওষুধ খাওয়ার পর উপসর্গ কমে গেলে অনেকেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। এতে জীবাণুর একটি অংশ ধ্বংস হলেও অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী জীবাণুগুলো টিকে যায় এবং ধীরে ধীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। পরবর্তীকালে সেই জীবাণুই আরও শক্তিশালী হয়ে নতুন সংক্রমণ সৃষ্টি করে। ফলে একই রোগের চিকিৎসায় আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়।
মানবস্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও কৃষিখাতেও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অনেক পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশুর খামারে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এসব ওষুধের অবশিষ্টাংশ খাদ্য, পানি ও পরিবেশের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ফলে প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার শুধু হাসপাতাল বা রোগীর শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পুরো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এই ধারণা অনুযায়ী মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলায়ও এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একা এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না; কৃষি, প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো রোগ নির্ণয়ের সীমিত সক্ষমতা। উন্নত দেশগুলোতে সংক্রমণের ধরন এবং জীবাণুর সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করে অ্যান্টিবায়োটিক নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর চিকিৎসা প্রচলিত। অনেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব নেই, জীবাণু শনাক্তকরণের পর্যাপ্ত সুবিধা নেই, প্রশিক্ষিত জনবলও সীমিত। ফলে চিকিৎসকদের অনেক সময় রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে অনুমানের ভিত্তিতে ওষুধ দিতে হয়। এতে অপ্রয়োজনীয় এবং বিস্তৃত কার্যক্ষমতার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে যে উদ্যোগগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নজরদারি কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন, জনবল প্রশিক্ষণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ কর্মসূচি এবং গবেষণা কার্যক্রম—সবই সঠিক পথে এগোনোর ইঙ্গিত দেয়। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় নীতিমালা প্রণয়নের চেয়ে তার কার্যকর বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। কাগজে-কলমে পরিকল্পনা থাকলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইউরোপের অনেক দেশে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা প্রায় অসম্ভব। হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচির মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি করা হয়। নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও সুইডেনের মতো দেশ প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে সফলতা অর্জন করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায় যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা একসঙ্গে কাজ করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন সবচেয়ে জরুরি হলো অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রোগনির্ণয় সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে চিকিৎসা অনুমানের ওপর নয়, পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ কার্যক্রমকে বাধ্যতামূলক করা এবং চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও জরুরি।
তবে কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জনগণের আচরণগত পরিবর্তন ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। মানুষকে বুঝতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সাধারণ জ্বর বা ব্যথার ওষুধ নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি গ্রহণ করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি নির্ধারিত কোর্স অসম্পূর্ণ রাখাও বিপজ্জনক। ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে লড়াই মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার লড়াই। আজ আমরা যদি দায়িত্বহীনভাবে এই ওষুধ ব্যবহার করি, তাহলে আগামী দিনের চিকিৎসাব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এমন এক সময় আসতে পারে, যখন সাধারণ ক্ষত, নিউমোনিয়া কিংবা মূত্রনালির সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহু অর্জন তখন অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকে শুধু স্বাস্থ্যখাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বহুমাত্রিক সংকট। নীরবে বেড়ে ওঠা এই বিপদকে মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ ইতিহাস বলে, অনেক দুর্যোগের আগমনী বার্তা আগে থেকেই শোনা যায়; কিন্তু সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে সেগুলো বিপর্যয়ে পরিণত হয়। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারও তেমনই একটি সতর্কবার্তা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বার্তা শুনতে প্রস্তুত?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এএসএম







