দেশের মানুষের গড় আয়ের চেয়ে গড় ব্যয় বেশি। এ জন্য ৪৭ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। এর মধ্যে এ বছরের শেষ নাগাদ ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন দরকার। পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের মানিক মিয়া মিলনায়তনে ‘খাদ্যনিরাপত্তার সতর্কবার্তা, পুষ্টি ও দারিদ্র্য অবস্থা এবং খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও ওয়েব ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, আগামী শীত থেকে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু সরকারের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে।

দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ ঋণগ্রস্ত—এমন পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিআইডিএসের মহাপরিচালক বলেন, শহরের মানুষের আয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও গ্রামের মানুষের ক্ষেত্রে তা নয়। তাই প্রতিটি এলাকার বাজারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা দরকার।

অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, সামনে মন্দা ও মূল্যস্ফীতির কারণে বড় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানুষের আয় কমে যেতে পারে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে এম এম আকাশ বলেন, খাদ্যসংকটের সঙ্গে আছে চুরি ও লুটপাট। সংকটের কারণে যাঁরা পিছিয়ে পড়বেন, তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে।

এ কে এনামুল হক, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস)আগামী শীত থেকে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু সরকারের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক সায়মা হক বিদিশা বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের পুষ্টির ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। এ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বরাদ্দ বাড়ানো এবং শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ এম শাহান। তিনি বলেন, বর্তমানে মানুষের মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। আর গড় ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় ৪৭ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য উল্লেখ করে আসিফ এম শাহান বলেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করার বদলে অতিরিক্ত দলীয় পদায়ন বর্তমানে খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অধ্যাপক এম এম আকাশ, অর্থনীতিবিদখাদ্যসংকটের সঙ্গে আছে চুরি ও লুটপাট। সংকটের কারণে যাঁরা পিছিয়ে পড়বেন, তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা তানিয়া শারমিন বলেন, দেশে চার সদস্যের একটি পরিবারের পুষ্টিসম্পন্ন খাবারের সংস্থান করতে মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা প্রয়োজন। সে জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েব ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী বলেন, জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে খাদ্য অধিকার আইন পাস করতে হবে। ‘খাদ্য অধিকার’ একটি মানবাধিকার, যা খাদ্য আইনে থাকা উচিত। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শুরু করা।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন গবেষক আহমেদ বোরহান এবং ওয়েল্টহাঙ্গারহিলফের (ডব্লিউএইচএইচ) হেড অব প্রোগ্রামস মলটে শুমেলফেডারসহ অনেকে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও স্বাগত বক্তব্য দেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী ও ওয়েব ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক কানিজ ফাতেমা।