পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ১৫০ টন কাঁচা তামাক ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এতে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো আছে কি না, তা যাচাই করে দেখছেন কাস্টমস গোয়েন্দারা। চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা ১০ কনটেইনার তামাক থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেশের একাধিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সন্দেহের সূত্রপাত তামাকের প্রাথমিক পরীক্ষায়। তাঁদের ভাষ্য, সাধারণভাবে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে তামাকপাতায় সহজে আগুন ধরেনি। এ কারণে তামাকের সঙ্গে দৃশ্যমান নয়—এমন অন্য কোনো পদার্থ মেশানো আছে কি না, তা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহমেদ।

রেজভী আহমেদ বলেন, ‘সাধারণ টেবিল টেস্টে এই তামাকপাতায় সহজে আগুন ধরছিল না। তাই এর মধ্যে অন্য কোনো ক্ষতিকর সাবস্ট্যান্স বা রাসায়নিক পদার্থ মেশানো আছে কি না, সে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। খালি চোখে এটি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।’

রেজভী আহমেদ জানান, প্রতিটি কনটেইনার থেকে পর্যাপ্ত নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন ও তদন্তে অবৈধ কিছু পাওয়া গেলে আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন্ড সুবিধায় এসেছে ১০টি কনটেইনার

কুষ্টিয়ার গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড বন্ড সুবিধায় ১০ কনটেইনার কাঁচা তামাক আমদানি করেছে। চালানটি এসেছে পাকিস্তান থেকে।

কাস্টমস গোয়েন্দার তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক নথিতে দুবাইয়ের ‘টেট্রা ট্রেড এফজেডসিও’ এবং পাকিস্তানের ‘আলী লিফ ট্রেডার্স’-এর নাম রয়েছে। চালানটির সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চট্টগ্রামের ইসলাম অ্যান্ড সন্স।

১৯ অক্টোবর চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন ২০ অক্টোবর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। তবে শুল্কায়ন ও খালাসের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি আটকে দেয় কাস্টমস গোয়েন্দা।

এর আগে গ্লোবাল লিফ টোব্যাকোর কুষ্টিয়ার কারখানায় অভিযান চালিয়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ভ্যাট কর্মকর্তারা। পরে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

তামাকের আমদানিমূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কাস্টমস গোয়েন্দারা। চালানটিতে প্রতি কেজির মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে ১ দশমিক ৪৫ ডলার।

কাস্টমস গোয়েন্দার হিসাবে, ১০ কনটেইনার তামাকের মূল্য কম দেখানোর মাধ্যমে প্রায় ২১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছে। মূল্য ঘোষণার এই অস্বাভাবিকতার সঙ্গে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রামে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহমেদ

‘৪৯৪ কোটি টাকার সিগারেট তৈরি সম্ভব’

সংবাদ সম্মেলনে কাস্টমস গোয়েন্দার মহাপরিচালক রেজভী আহমেদ বলেন, বন্দরে আটকে রাখা প্রায় ১৫০ টন তামাক দিয়ে বিপুল পরিমাণ সিগারেট তৈরি করা সম্ভব।

কাস্টমস গোয়েন্দার হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ তামাক দিয়ে প্রায় ২১ কোটি ৪৩ লাখ শলাকা প্রিমিয়াম সিগারেট তৈরি করা যেত। ওই সিগারেটের বাজারমূল্য প্রায় ৪৯৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে দাবি করেন কর্মকর্তারা।

তাঁদের ভাষ্য, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে তামাকটি খোলাবাজারে চলে গেলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাত এবং বৈধ সিগারেট প্রস্তুতকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ত।

খালাস বন্ধ, বন্ড লাইসেন্সও স্থগিত

অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা ১০ কনটেইনার তামাকের খালাস বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগে গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানির বন্ড লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিচারাধীন। শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চালানটি খালাসের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও জানান, চালানটির সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অতীত কার্যক্রমও খতিয়ে দেখা হবে।

কাস্টমস গোয়েন্দার অভিযান নিয়ে জানতে চাইলে গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানির একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। কোম্পানি প্রাপ্যতা অনুযায়ী কাঁচামাল আমদানি করেছে। যে দামে কাঁচামাল আমদানি হচ্ছে, তার দ্বিগুণ বা তিন গুণ দামে রপ্তানি হচ্ছে। অর্থাৎ মূল্য সংযোজন হচ্ছে। কাস্টমস গোয়েন্দা যেসব বিষয়ে অভিযোগ করেছে, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেন এই পরিচালক।

তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাঁচা তামাকে আর্দ্রতা বেশি ফলে সহজে আগুন ধরার কথা নয়। পরীক্ষা করা হোক। কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তর বা যেকোনো সংস্থা তদন্ত করে দেখুক। আমরা সহযোগিতা করব।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানি গত অর্থবছরে ১ কোটি ৩ লাখ ডলারের তামাক রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ১২৭ কোটি টাকা। প্রতি কেজি তামাক গড়ে ৩ ডলার ৬০ সেন্টে রপ্তানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের ৯টি দেশে তারা তামাক রপ্তানি করেছে।