ছোট্ট সাবরিনা। আব্বা, বাবা-বাবা ছোট ছোট শব্দে বাবাকে ডাকছে। কিন্তু সে জানে না, এই ডাকে সাড়া দেওয়ার সেই ‘বাবা’ আজ আর নেই। ওর ডাক শুনে নিঃশব্দে প্রকৃতির পাশাপাশি কাঁদে ওর মা সাদিয়া আক্তারও। বাবার রক্তে স্নাত নতুন সূর্যোদয়ের আলোয় ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি তার জন্ম। তার পুরো নাম সাবব্রিনা বিনতে সিদ্দিকা।
রঙিন কাপড়ের বিছানায় এদিক-সেদিক সে ছুটছে। হাত-পা নাড়ছে, খেলনার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। অস্পষ্ট উচ্চারণে আ-আ, ও,ও নানা শব্দের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে বাবা-আব্বা উচ্চারণ। সে ডাকছে, তিনি তো সাড়া দিচ্ছেন না। কারণ সেই মানুষটি আজ নেই। পুলিশের বুলেট তার সেই আদরের বাবা নুরে আলম সিদ্দিকী রাকিবকে কেড়ে নিয়েছে। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় তিনি শহীদ হন। তিনি গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাঁও মধ্যপাড়ার আব্দুল হালিম শেখের ছেলে।
জানা যায়, রাকিব ২০২৪ সনের ১২ জানুয়ারি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার পুনাইল গ্রামের সাদিয়া আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি মারা যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০ জুলাই গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় তিনজন শহীদ হন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন রাকিব।
মঙ্গলবার এ প্রসঙ্গে রাকিবের স্ত্রী সাদিয়া বলেন, ও যখন বাবা বলে, তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আমার স্বামী বলত, ‘আমি বাবা হব, তুমি মা হবে; আমাদের ঘর উজ্জল করে তুলবে, বাবা-মা বলে ডাকবে। আমার তো এখন চাকরিটা নেই, এখন কাজও নেই, খরচ বাড়বে। কয়েকদিনের মধ্যেই কাজে যোগ দেব।’ রাকিবের স্ত্রী আর মেয়ে রয়েছেন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার পুনাইল গ্রামে। এটি রাকিবের শ্বশুরবাড়ি।
সাদিয়া আরও জানান, তার স্বামী সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। ও আসবে, ওর জন্য ঘর সাজাতে হবে। কত আবেগ-আপ্লুত ছিল সে। সব স্বপ্ন একটি গুলিতে শেষ হয়ে গেল। আমার সন্তান তার বাবার মুখ দেখতে পারল না, বাবা তার স্বপ্নকে স্পর্শ করতে পারল না। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
রাকিবের বাবা বলেন, জন্মের পর সে তার বাবাকে দেখতে পারল না। আমি ওকে স্পর্শ করে হারিয়ে যাওয়া সন্তানের গন্ধ অনুভব করি। আমি ছেলে হত্যার বিচার যেন দেখে যেতে পারি। রাকিবের মা নুরুন নাহার জানান, আন্দোলনের দিন পুত্রবধূর ওষুধ আনতে কলতাপাড়া বাজারে গিয়ে তিনি শহীদ হন।
সাবব্রিনার মামা শামীম আহমেদ জানায়, আমার ভগিনীপতি শহীদ হন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। তার সন্তান যেন বৈষম্যের শিকার না হয়। সে যেন তার প্রাপ্য অধিকারটুকু পায়।







