পানি কিনতে মোটরসাইকেল থামিয়েছিলেন বাবা, সঙ্গে ছিল স্কুলপড়ুয়া ছেলে। মুহূর্তেই কোমরে ঠেকল পিস্তল। এরপর একটি পুরোনো ভবনের চিলেকোঠায় আড়াই ঘণ্টার বিভীষিকা। ছেলের চোখের সামনে চলল বাবার ওপর নির্মম নির্যাতন। আতঙ্কে বমি করে ফেলে শিশুটি। রাজধানীর মিরপুর রোডের কল্যাণপুরে ফিল্মি স্টাইলে তাদের অপহরণ করে এভাবেই অর্থ হাতিয়ে নেয় একটি ছিনতাইকারী চক্র।
এ ঘটনায় প্রচণ্ড মানসিক ট্রমায় ভুগছেন ভুক্তভোগী বাবা মো. মাহফুজুর রহমান সরকার ও ছেলে মো. মাহরুছ রহমান সরকার। মাহরুছ মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাউন্সেলিং নিচ্ছেন মাহফুজুরও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু একটি ছিনতাইয়ের নয়; বরং রাজধানীতে সংঘবদ্ধ অপরাধের ভয়াবহ চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে।
মাহফুজুর রহমান সরকার জানান, ২ জুলাই রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি মোটরসাইকেলে ছেলেকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের আত্মীয়ের বাসা থেকে সবুজবাগের বাসায় ফিরছিলেন। পথে কল্যাণপুর এলাকায় দারুসসালাম জামে মসজিদের নিচে একটি দোকান থেকে পানি কেনার জন্য থামেন। পানি নিয়ে মোটরসাইকেল চালু করতেই এক ব্যক্তি পেছনে উঠে তার কোমরে পিস্তল ঠেকিয়ে বসে। একই সময় আরও তিন থেকে চারজন এসে তাদের ঘিরে ফেলে।
মাহফুজুর রহমান বলেন, ওরা আমাকে বলল, কোনো চিৎকার করবি না। মোটরসাইকেল এখানে রেখে আমাদের সঙ্গে চল। ছেলেটা পাশে ছিল। অস্ত্র দেখে আমরা কিছুই বলতে পারিনি। পরে মসজিদের পাশের একটি গলি দিয়ে আমাদের একটি পুরোনো ভবনের চিলেকোঠায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শারীরিক নির্যাতন। একপর্যায়ে ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং ও ফোন তল্লাশি করা হয়। পর্যাপ্ত টাকা না পেয়ে বিভিন্নজনকে ফোন করে টাকা জোগাড় করতে চাপ দেওয়া হয়। পরে পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে দিতে বাধ্য হই।
মাহফুজুর রহমান জানান, তাকে মারধর করা হলে তার ছেলে আতঙ্কে বমি করে ফেলে। পরে শিশুটিকে পাশের একটি কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু বাবার আর্তচিৎকার সে শুনতে পাচ্ছিল। তিনি বলেন, আমার ছেলে কোনো দিন এমন দৃশ্য দেখেনি। ও শুধু কাঁদছিল। আমি ওদের কাছে বারবার অনুরোধ করেছি যেন ছেলেটার সামনে কিছু না করে। ভুক্তভোগীর দাবি, চিলেকোঠায় মোট ছয় থেকে সাতজনকে দেখেছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুজনের কাছে দেশীয় অস্ত্র ছিল। সবাই একে অপরকে নাম ধরে ডাকেনি। তবে একজনকে অন্যরা ‘ক্যাপ্টেন’ বলে সম্বোধন করছিল এবং তার নির্দেশেই পুরো কার্যক্রম চলছিল।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখার পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাবা-ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তাদের মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা এবং মোটরসাইকেল রেখে দেওয়া হয়। একটি সিএনজিতে তুলে দেওয়ার আগে তাদের হুমকি দেওয়া হয়, ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ বা অন্য কাউকে জানালে পরিবারসহ হত্যা করা হবে।
ঘটনার পর থেকেই বদলে যায় শিশু মাহরুছের আচরণ। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী কারও সঙ্গে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দেয়। খাওয়া-দাওয়া কমে যায়, ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠে এবং আতঙ্কে বারবার কেঁপে ওঠে। রোববার রাতে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে সে সিসিইউতে চিকিৎসাধীন।
অন্যদিকে মাহফুজুর রহমানও মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। তিনি জানান, গত কয়েকদিন ধরে তিনি মনোরোগ চিকিৎসকের কাউন্সেলিং নিচ্ছেন। ছিনতাইকারীদের হুমকির কারণে থানায় সরাসরি মামলা না করে পৃথক তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, দারুসসালাম জামে মসজিদের নিচে একটি কনফেকশনারি দোকান রয়েছে। পাশে মীরবাড়ি আদি মসজিদ রোডে কবরস্থান লাগোয়া (৯২/২ নম্বর) একটি পুরোনো চারতলা ভবন। যার নিচতলায় লালবাগ তেহারি ঘর নামে একটি খাবারের দোকান চালু আছে। ভবনটিতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও ছাদে একটি চিলেকোঠা দেখা যায় এবং সেখানে প্রবেশের গেট বন্ধ পাওয়া যায়।
জানা যায়, ভবনের দ্বিতীয় তলায় বাড়ির মালিক থাকেন। সেখানে গিয়ে জানতে চাইলে নাজমা বেগম বলেন, ওপরের তলাগুলোতে বর্তমানে কোনো ভাড়াটিয়া নেই। তবে চিলেকোঠার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
মসজিদের নিচের দোকানি মোতাহার জানান, ঘটনার রাতে তিনি একজন লোককে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে এবং মোটরসাইকেল রেখে গলির ভেতরে যেতে দেখেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় একাধিক ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, গভীর রাতে কিছু চক্র সড়কে অবস্থান নেয়। কাউকে টার্গেট করলে অস্ত্রের মুখে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। অনেক সময় গলির ভেতরের নির্দিষ্ট বাসা বা কক্ষে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনাও শোনা যায়। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খোলে না।
এ বিষয়ে দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী সাধারণ ডায়েরি করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিষয়টি যেহেতু আমাদের নজরে এসেছে, পুলিশ নিজ উদ্যোগেও ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।







