কক্সবাজারে পুরো বছরজুড়েই ডেঙ্গুর চোখরাঙানি অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৪৭ জন। এদের মাঝে ১৭৬ জন স্থানীয়, আর রোহিঙ্গা ৪৭১ জন। তবে নিয়মিতভাবে মাসে গড়ে শতাধিক আক্রান্ত থাকলেও কোনো মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
সূত্র জানায়, শীতকালে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব এখনো পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রতিদিন হামের লক্ষ্মণে রোগী আসছে হাসপাতালে। এরই মাঝে প্রতিদিনই কমবেশি ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়েও ভর্তি হচ্ছেন কেউ না কেউ। বিশেষ করে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সারাবছরই ডেঙ্গুর সংক্রমণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে স্বাস্থ্য বিভাগ বাড়তি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় স্থানীয় ১৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ১৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এদের মাঝে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ১১ জন, উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন এবং মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন ভর্তি।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু: মৌসুমি রোগ থেকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট
আর একইদিন ১০ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়েন। সেদিন নতুন করে ভর্তি হয়েছেন পাঁচজন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মাঝে চারজনই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং একজন মহেশখালীর।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা পঙ্কজ পাল জানান, চলতি বছর জেলায় স্থানীয় ১৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। এটিকে স্বস্তিদায়ক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংক্রমণ বেশি
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, কক্সবাজার জেলায় স্থানীয় জনগণের তুলনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলেও এখন পর্যন্ত ক্যাম্পে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন
এবছরও বরগুনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
বছরের ৮-৯ মাসই দেশজুড়ে ডেঙ্গুর দাপট, বদলেছে মশার চরিত্র
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাম্পে ঘনবসতি, জমে থাকা পানি এবং পরিবেশগত নানা কারণে এডিস মশার বিস্তারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই সেখানে নিয়মিত নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
সচেতনতায় জোর স্বাস্থ্য বিভাগের
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরও সচেতন হওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
তিনি জানান, এরই মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র্যালি, লিফলেট বিতরণ, প্রচারণা এবং জনসচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এই কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে।

সিভিল সার্জন বলেন, সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে জনগণের সচেতনতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।
ডেঙ্গু লক্ষণে সতর্কতা
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির জানান, ডেঙ্গু একটি এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। এর প্রধান লক্ষণ উচ্চমাত্রার জ্বর যা ৯৯ থেকে ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। জ্বর টানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে কমে গিয়ে পুনরায়ও আসতে পারে।
আরও পড়ুন
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গু, সতর্ক থাকার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার
তিনি বলেন, জ্বরের পাশাপাশি শরীরব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমিভাব এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডা. শাহজাহান আরও বলেন, অনেকেই জ্বর হলে পাশের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে থাকেন। এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ডেঙ্গু হলে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ ভুল ওষুধ বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ সেবনে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
প্রতিরোধই ডেঙ্গুর সবচেয়ে কার্যকর উপায়
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, এডিস মশা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে জন্মায়। তাই বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, নারিকেলের খোসা, ভাঙা পাত্র, টায়ার কিংবা যেকোনো স্থানে দুই থেকে তিন দিন পরিষ্কার পানি জমে থাকলে সেখানে মশার লার্ভা জন্মাতে পারে। বর্ষার বৃষ্টিতে এটি সবচেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা।
সবাইকে নিয়মিত বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি দিনের বেলা বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকতে হবে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে ডেঙ্গু: ২৭ বছরের এক ‘অবহেলিত’ জনস্বাস্থ্য সংকট
রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশারি ব্যবহার নিশ্চিতের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া ঘরের দরজা-জানালায় নেট ব্যবহার এবং মশা প্রবেশের সুযোগ কমিয়ে আনারও আহ্বান জানান স্বাস্থ্য বিভাগের জেলার সর্বোচ্চ এ কর্মকর্তা।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বর্ষার সামনের দিনে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই জ্বরকে সাধারণ ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখলেই ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এসএএল/এফএ/জেআইএম








