বঙ্গোপসাগরে বিরাজমান বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পটুয়াখালীর আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে ভিড় করেছে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার শত শত মাছ ধরার ট্রলার। গভীর সমুদ্রে ঝড়ো হাওয়া, দমকা বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে মাছ ধরার বন্ধ রেখে জেলেরা ট্রলার নিয়ে ঘাটে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই দুই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে সৃষ্টি হয়েছে ট্রলারের দীর্ঘ সারি।

শনিবার (৪ জুলাই) দিনভর আলীপুর ও মহিপুর ঘাটে শত শত ট্রলার নোঙর করে থাকতে দেখা যায়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, হাতিয়া, নোয়াখালী, ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা জেলেরা আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঘাটেই অপেক্ষা করছেন। অনেকেই ট্রলারে অবস্থান করছেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, বরফ ও জ্বালানি সংগ্রহ করে রাখেন।

জেলেরা জানান, কয়েকদিন ধরে সাগর উত্তাল থাকায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ দমকা বাতাস ও বড় বড় ঢেউয়ের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তারা তীরে ফিরে এসেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে এলে আবারও মাছ ধরার উদ্দেশ্যে সাগরে যাবেন বলে জানান তারা।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় শুধু জেলেরাই নয়, বিপাকে পড়েছেন ট্রলার মালিক, আড়তদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও। ঘাটে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তবে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে কেউই ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যেতে আগ্রহী নন।

কক্সবাজার থেকে ‘মা-বাবার দোয়া’ ট্রলার নিয়ে আসা মাঝি আহসান বলেন, আমরা কয়েকদিন আগে মাছ ধরার জন্য গভীর সমুদ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। সাগরে প্রচণ্ড বাতাস ও বিশাল ঢেউয়ের কারণে ট্রলার নিয়ন্ত্রণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরা সম্ভব ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে আলীপুর ঘাটে আশ্রয় নিয়েছি। এখন আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছি। ঘাটে বসে প্রতিদিনই খাবার, বরফ ও অন্যান্য খরচ বাড়ছে। মাছ ধরতে না পারায় কোনো আয় নেই, অথচ ট্রলারের কর্মীদের খরচ চালাতে হচ্ছে।

আলীপুরের জেলে বোরহান মোহাম্মদ বলেন, আমাদের সংসার পুরোপুরি মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। কয়েকদিন ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রে যেতে পারছি না। ফলে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে। একদিকে আয় বন্ধ, অন্যদিকে সংসারের খরচ থেমে নেই। ঝুঁকি নিয়ে সাগরে গেলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই জীবন বাঁচাতে ঘাটে অবস্থান করছি। আল্লাহর রহমতে আবহাওয়া ভালো হলে আবার মাছ ধরতে যাব।

আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার মো. কামাল বেপারী বলেন, আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ মাছ ওঠে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে শত শত ট্রলার ঘাটে আশ্রয় নেওয়ায় মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে আড়তে মাছের সরবরাহ অনেক কমে গেছে। শুধু আড়তদার নয়, মাছ বহনকারী শ্রমিক, বরফকল, পরিবহন শ্রমিক ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও কাজ না থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

ভাই ভাই ফিশের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে শত শত ট্রলার আলীপুর ও মহিপুর ঘাটে আশ্রয় নিয়েছে। এতে মাছের আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছ সরবরাহেও প্রভাব পড়ছে। জেলে, ট্রলার মালিক, ব্যবসায়ী সবাই এখন ক্ষতির মুখে। তবে জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়া অনুকূলে এলে আবার স্বাভাবিকভাবে মাছ ধরা ও বেচাকেনা শুরু হবে বলে আমরা আশা করছি।

পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবা সুখী বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩নং সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। সাগর উত্তাল থাকায় দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে এবং মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত জেলেদের সর্বশেষ আবহাওয়া বার্তা অনুসরণ করতে হবে।


আসাদুজ্জামান মিরাজ/এফএ