সংসার নামক এই প্রকাণ্ড হাটখানায় মানুষের কত কিছুই না বিকিকিনি হয়! চাল–ডাল, সোনা–দানা থেকে শুরু করে মানুষের শ্রম, মেধা—সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু তাই বলে মানুষের হৃদয়বৃত্তি? স্নেহ, মায়া, মমতা এবং সর্বাগ্রে ওই যে ‘ভালোবাসা’ নামক বস্তুটি, এটিও যে হাটের মাঝখানে দাঁড়িপাল্লায় চড়ে কেজি দরে বিক্রয় হবে, তা কি কোনো দিন কেউ ভেবেছিল? অতীতে যা ছিল দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত পূজার নৈবেদ্য, আজ তা পরিণত হয়েছে সস্তা বাজারের পণ্যে।
আজকাল বড় অদ্ভুত এক বাণিজ্য শুরু হয়েছে। প্রেমের বাজারে এখন আর হৃদয়ের কোনো কারবার নেই, সবটাই কেবল লাভ ও ক্ষতির নিপুণ হিসাব। হাটের মাঝখানে ভালোবাসার পসরা সাজিয়ে বসেছেন কোনো এক পাকা ব্যাপারী। সেখানে দাঁড়িপাল্লায় মাপা হচ্ছে আবেগ। ক্রেতা আসছেন, হাতে তাঁর দুনিয়াদারির মানদণ্ড। তিনি মেপে দেখতে চান, এই ভালোবাসার বিনিময়ে তাঁর ঝুলিতে কতটা সামাজিক প্রতিষ্ঠা, কতটা নিরাপত্তা কিংবা কতটা বৈষয়িক লাভ এসে জমা হবে। ভালোবাসা আজ সত্যিই কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সম্পদের ওজন যত ভারী, প্রেমের কদরও যেন তত বেশি।
আজকাল এই কোলাহলময় হাটে একটু নিবিষ্ট মনে কান পাতলে এক অদ্ভুত মৃত্যুর শোক অনুভব করা যায়। এটি রক্তমাংসের মৃত্যু নয়, এটি মানুষের ভেতরের সেই চিরন্তন ও নিঃস্বার্থ সত্তাটির নীরব অপমৃত্যু। যে হৃদয় এককালে বিনা শর্তে নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে জানত, আজকাল এই বিকিকিনির ভিড়ে তা কবেই যেন নীরবে প্রাণত্যাগ করেছে। এই লাভ–ক্ষতির পাষাণপুরীতে যদি কোনো ভাগ্যহীন আজও সেই খাঁটি অনুভূতির মৃতদেহটি বুকে আঁকড়ে এসে দাঁড়ায়, তবে সে কেবলই এক হিমশীতল শূন্যতার সম্মুখীন হয়। এখানে প্রাণের কোনো স্পন্দন নেই, কেবলই দাঁড়িপাল্লার যান্ত্রিক শব্দ। খাঁটি প্রেম আজ এমন এক বিমূর্ত হাহাকার, যার কোনো শরীর নেই; কেবল এক অশরীরী দীর্ঘশ্বাস হয়ে সে এই নিষ্ঠুর বাজারের চারপাশে ঘুরে মরে। মানুষ এখন আর ভালোবাসে না, কেবল এক অদৃশ্য শবদাহের আয়োজনে মেকি হাসির মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
এই হাটে দরদামেরও কোনো অন্ত নেই। মানুষের মন আজ এক চতুর মহাজনের রূপ ধারণ করেছে। ‘আমি তোমাকে এতখানি সময় দিলাম, এতখানি যত্ন দিলাম, বিনিময়ে তুমি আমায় কী দেবে?’ এ প্রশ্নই আজ যেন প্রতিটি সম্পর্কের অলিখিত চুক্তিপত্র। দর–কষাকষিতে যার পোষায়, অর্থাৎ যার মনে হয় যে তার প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে সে যথেষ্ট লাভবান হচ্ছে, সে–ই পরম তৃপ্তিতে সেই ভালোবাসার সামগ্রীটুকু হাসিমুখে তুলে নেয়। তখন চারপাশে উৎসবের রোশনাই জ্বলে, সমাজও হাততালি দিয়ে সেই সফল লেনদেনকে পুণ্য পরিণয় বা সার্থক প্রেম বলে স্বীকৃতি দেয়।
কিন্তু যদি দর না পোষায়? যদি দেখা যায়, ভালোবাসার পাল্লাটি পার্থিব লাভের দিক দিয়ে কিঞ্চিৎ হালকা হয়ে গেছে? তবে আর মুহূর্তের অপেক্ষাও নেই। যে মানুষটি গতকালও অনন্ত প্রেমের শপথ করেছিল, দর না মিলিলে সে–ই আজ বাতাসের বেগে ছুটে পলায়ন করে। একবার পেছন ফিরে চাওয়ার, কিংবা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলার ফুরসতটুকুও তার মেলে না। স্বার্থের সামান্য ঘাটতি ঘটলেই মিথ্যা মোহের বাঁধন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তখন সেই ফেলে যাওয়া ভালোবাসার দিকে চেয়ে কাঁদারও কেউ থাকে না, কেবল শূন্য হাটে বঞ্চনার হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে।
সত্যিই কি একে ভালোবাসা বলে? যে প্রেম শরতের আকাশের মতো অবারিত, স্বার্থহীন ও পবিত্র হওয়ার কথা ছিল, তা আজ লোভের পঙ্কে ডুবে হাটের সস্তা পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে সমাজে হৃদয় কেবলই কেজি দরে বিক্রি হয় এবং দর না মিলিলে মানুষ বাতাসের বেগে পলায়ন করে, সে সমাজে খাঁটি প্রেমের স্থান আর কোথায়? হয়তো কোনো এক নিভৃত কোণে, লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রকৃত ভালোবাসা আজও নীরবে অশ্রুপাত করছে, আর এই স্বার্থান্ধ পৃথিবীর নির্মম বিকিকিনির মেলা দেখে আপন মনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলতেছে।
*লেখক: কে এম ফারহাত স্নিগ্ধ, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার








