বাজেট বাস্তবায়ন ও দেশের সার্বিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসাবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেছেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সমাজে জবাবদিহি, সততা ও স্বচ্ছতার অভাবই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ সময় সভাপতিত্ব করেন।

দেশের বর্তমান অর্থবছর (জুলাই-জুন) পরিবর্তন করে ‘জানুয়ারি-ডিসেম্বর’ভিত্তিক অর্থবছর চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, জুলাই-জুন অর্থবছর হওয়ার কারণে বছরের শেষের দিকে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে তাড়াহুড়া করে কাজ করা হয়। এর ফলে প্রথম ১০ মাসে যেখানে মাত্র ৪২ শতাংশ কাজ হয়, সেখানে শেষ সময়ে বাকি কাজ করতে গিয়ে অপচয় ও লুটপাটের দুয়ার উন্মুক্ত হয়। এই সংকট নিরসনে দেশের অর্থবছরকে জুলাই-জুনের পরিবর্তে ক্যালেন্ডার ইয়ার বা জানুয়ারি-ডিসেম্বর মেয়াদে নির্ধারণ করা হলে বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং আর্থিক পরিকল্পনায় আরও সমন্বয় আসবে ও প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। জনগণের ট্যাক্সের টাকার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার হবে।

বিরোধী দলের নেতা বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ আখ্যা দিয়ে আশা প্রকাশ করেন, সংসদ এমন কোনো আচরণ করবে না যা মজলুম দেশবাসীকে আঘাত করে, বরং এটি জাতিকে স্বপ্ন দেখাবে, ঐক্যবদ্ধ করবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নেবে। এ সময় শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার দাবি করেন তিনি।

বিরোধী দলের নেতা বলেন, সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান-কবিতা গাওয়ার অতীত অপসংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। কারণ সংসদ কোনো তোষামোদের জায়গা নয়। এটি দায়িত্ব পালনের জায়গা। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই পবিত্র সংসদে যেন আর কোনো চরিত্র হননের কাজ না হয়, এই আহ্বান জানাই। তিনি বলেন, সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল-সবার চিন্তাধারা এক হওয়া সম্ভব নয়। সবার চিন্তা একইরকম হলে এত লোকের বক্তৃতা বা এত সময় খরচের প্রয়োজন হতো না। দুই পক্ষ থেকে একজন করে কথা বললেই চলত। আমরা জনগণের ভালোবাসা এবং ভোটে নির্বাচিত হয়ে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এই সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছি। তাই প্রত্যেকেই নিজের বিবেক, মহান আল্লাহ এবং প্রিয় জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।

বাজেট অধিবেশনকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের নেতা বলেন, বাজেটের ভিত্তির ওপরই পুরো বছরটি কেমন যাবে তা নির্ভরশীল এবং সব সদস্য সেই দায়িত্ববোধ থেকেই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি দলের সব অভিপ্রায় বিরোধী দল চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে না, আবার সরকার ভালো কোনো উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল কেবল বিরোধিতার খাতিরে তার বিরোধিতা করবে না। সরকারি দলকে বিরোধী পক্ষকে সম্মান করার এবং বিরোধী দলকে সরকারকে সংগত কারণে সহযোগিতা করার মানসিকতা রাখতে হবে।

সংসদকে একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে বিরোধী দলের নেতা বলেন, সংসদ মূলত দুটি চাকার ওপর চলে। এর একটি সরকারি দল এবং অন্যটি বিরোধী দল। যে কোনো একটি চাকা অকেজো হয়ে গেলে পুরো যানবাহনটিই অচল হয়ে পড়বে। তাই এই দুটি চাকাকেই সচল রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, চাকায় পিন বা পেরেক মেরে ফুটো করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সংসদে কুচি কুচি করে কাটার পর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানোর যে মানসিকতা, সেই বিভাজনের যন্ত্রটি ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দেন বিরোধী দলের নেতা। সরকারি দলের কেউ কেউ এই সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন আবার কেউ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বৈচিত্র্যই সংসদের সৌন্দর্য।