মাহাফুজা শিরিন

মহাকালের চেনা পথ ধরে প্রতি বছর বাইশে শ্রাবণ আসে। রবিভক্তদের কাছে এটি এক গভীর শূন্যতার দিন। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ (১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট) শ্রাবণের সজল বাতাসে ভেসে এসেছিল এক গভীর বিষাদের সুর। যে কবি জীবনভর গেয়েছেন আলো, রূপ ও রসের জয়গান—তাঁর কাছে মৃত্যু কোনো চূড়ান্ত অবসান ছিল না; তা ছিল অনন্তের পথে এক রূপান্তর মাত্র। কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এক মহাজীবনের পার্থিব স্পন্দন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অনবদ্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালির মণিকোঠায় স্থায়ী ঠাঁই নিয়েছেন। কিন্তু মানব জীবনের স্বাভাবিক পরিসমাপ্তিকে তিনি বরণ করেছিলেন পরম শ্রদ্ধায়। মৃত্যু নিয়ে কবিগুরু লিখেছেন, ‌‘মৃত্যু দিয়ে যে প্রাণের মূল্য দিতে হয়/ সে প্রাণ অমৃতলোকে মৃত্যুকে করে জয়’।

আরও পড়ুন

জাকির জাফরানের কবিতার শিল্পরূপ

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদাসুন্দরী দেবীর কোলে জন্ম নেওয়া এই মহাজীবনের সাহিত্য প্রতিভার উন্মেষ ঘটেছিল শৈশবেই। আট বছর বয়সে লেখালেখির হাতেখড়ি হওয়ার পর ১৮৭৪ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা ‘অভিলাষ’। এরপর শুরু হয় এক বিরামহীন সৃষ্টিযজ্ঞ। কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও নাটক মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যকে তিনি দিয়েছেন অনন্য পূর্ণতা। ১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য ১৯১৩ সালে তিনি লাভ করেন নোবেল পুরস্কার।

আত্মপরিচয়ের সংকট কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের সময়ে তাঁর অভয়বাণী আজও বাঙালিকে পথ চলার শক্তি জোগায়: ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’। বাঙালি জীবনের প্রতিটি অনুভূতি, সংকট ও সম্ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ এক অমোঘ আশ্রয়। বৈশাখের উত্তাপ থেকে শ্রাবণের অঝোর ধারা, বসন্তের মাতাল সমীরণ থেকে শীতের রিক্ততা—প্রকৃতির রূপবদলের সাথে মানুষের মনের আলো-ছায়াকে তিনি বেঁধেছেন সুরের সুতোয়। শুধু আনন্দ বা বিরহেই নয়, বিশ্বমানবতার সংকটকালে রবীন্দ্র-চিন্তা সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখিয়েছে।

আরও পড়ুন

খৈয়াম কাদেরের কবিতার তাত্ত্বিক পাঠ

​রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে মৃত্যু কোনো ভীতিপ্রদ বস্তু নয় বরং তা জীবনেরই পরিপূরক এক পরম সত্য। ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’ বলে যিনি জীবনতৃষ্ণার ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছিলেন, তিনিই আবার শান্ত ও অবিচল চিত্তে লিখেছেন, ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।’ জীবনের বিচিত্র আনন্দ-বেদনাকে তিনি যেভাবে বরণ করেছেন, ঠিক একইভাবে পরম মমতায় আলিঙ্গন করেছেন মৃত্যুকেও। তাঁর দর্শনে—দিন শেষে রাত্রি যেমন ক্লান্তি দূর করে নতুন প্রভাতের বার্তা আনে, তেমনি মৃত্যুও জীবনকে দান করে মহত্ত্ব ও অনশ্বরতা।

২২ শ্রাবণের এই স্মৃতিবহ দিনে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবনদর্শনকে অন্তরে ধারণ করাই সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি। আশি বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে কবির প্রয়াণের, কিন্তু মহাকালের স্রোতে তাঁর সাহিত্যের জ্যোতি বিন্দুমাত্র নিষ্প্রভ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ কেবল অতীতের কোনো স্মারক নন; তিনি আমাদের নিত্যদিনের আবেগ, চেতনা ও অস্তিত্বের অবচ্ছেদহীন অংশ।

এসইউ