ফরিদপুর শহরের টেপাখোলায় অবস্থিত সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ছয় মাস পর জানাজানি হলে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এরই মধ্যে চার সদস্যের গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিকেলে জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও তদন্ত কমিটি সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর আগে গত ২৯ জুলাই জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলামের কাছে গঠিত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে প্রতিবেদনে তিনটি প্রধান কারণের মধ্যে রয়েছে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, উদাসীনতা ও অবহেলা।

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা হয়। মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেফতারের পর তিনি কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনায় গত ৭ জুলাই জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহাকে। সদস্যসচিব করা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার জান্নাতুল সুলতানাকে।

অন্য দুই সদস্য হলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আজমীর হোসেন এবং সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি চিকিৎসা কর্মকর্তা নূপুর পাল। তদন্ত কমিটি গত ১৩ জুলাই থেকে তদন্তকাজ শুরু করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চার সদস্যের মধ্যে কমিটির এক সদস্য বলেন, শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন না করা; আয়া, প্রহরীসহ অন্য কর্মচারীরাও একই ধরনের দায়িত্বহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাদের কেবল মাত্র চাকরি করার মানসিকতার প্রতিফলন দেখা গেছে।

তদন্ত কমিটির সদস্যদের ভাষ্য মতে, কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত দর্জির ‘বিকৃত রুচি’কেও ঘটনার আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য জানান, ওই শিশুনিবাসের কিশোরীদের একটি বড় অংশ রয়েছে যাদের মানসিকতা বেপরোয়া। কিন্তু বেপরোয়া মানসিকতার কিশোরীদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। কিশোরীদের মধ্যে অনেকেই রয়েছে তারা দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করা ও বাইরে বের হয়ে যাওয়া এবং গভীর রাত করে ফেরার প্রমাণ রয়েছে। যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিবাসীরা যেসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, সেসব বিদ্যালয় থেকে নিয়মিত ক্লাস না করাসহ একাধিক বিষয় নিয়ে বারবার তত্ত্ববধায়ককে জানানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি সংশ্লিষ্ট তত্ত্ববধায়ক।

ওই তদন্ত কমিটির ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওই কিশোরীটি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ছয় মাস পর বিষয়টি জানাজানি হয়। যা কর্তৃপক্ষের সীমাহীন গাফিলতি হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী কিশোরীর পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই কিশোরী অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে বড় হয়েছে, মায়ের মৃত্যুর পর সৎমায়ের সংসারে ছিল। যার ফলে কিশোরীটি ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে।

এদিকে তদন্ত শেষে কমিটি শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে একজন নারী কর্মকর্তাকে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। সেই সঙ্গে মাসে অন্তত একবার নিবাসীদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রতিষ্ঠানে আগত দর্শনার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তির তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ছয়জন হলেন, সহকারী পরিচালক ও শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার, আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক সুস্মিতা সাহা বলেন, বালিকাদের এই প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে একজন নারী থাকলে তা অধিক উপযোগী হবে। পাশাপাশি নিবাসীদের নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা নিশ্চিত করাও প্রয়োজনও রয়েছে।

এ বিষয়টি নিয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি গত ২৯ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এন কে বি নয়ন/এফএ/জেআইএম