বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও শিল্প খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য এখনো স্পষ্ট-একদিকে নতুন শিল্প স্থাপনের অগ্রগতি, অন্যদিকে বহু বিদ্যমান শিল্প-কারখানা বন্ধ, অলস বা আংশিকভাবে সচল অবস্থায় পড়ে আছে। এ বিশাল অকার্যকর শিল্পসম্পদ যদি সঠিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তাহলে তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপি বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে।

দেশে বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, চিনিকল, টেক্সটাইল মিল, পেপার মিল, কেমিক্যাল কারখানা, চামড়াশিল্প, শিপবিল্ডিং ও মেরামত কারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প। বিশেষ করে পাটশিল্প বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক শক্তি ছিল। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো দীর্ঘসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস হিসাবে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে পুরোনো প্রযুক্তি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, অতিরিক্ত জনবল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বৈচিত্র্যহীনতার কারণে বেশির ভাগ মিল লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে ১৫টিরও বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বছরের পর বছর লোকসানে চলার পর কার্যকারিতা হারিয়েছে। অথচ এসব শিল্প সঠিকভাবে আধুনিকায়ন করলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে। যেমন চিনিকলগুলো শুধু চিনি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ না থেকে বায়োএথানল, শিল্প অ্যালকোহল, বিদ্যুৎ সহ-উৎপাদন, মোলাসেসভিত্তিক রাসায়নিক শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসাবে রূপান্তরিত হতে পারে। সরকারি ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিল্প খাত জিডিপির প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। তবে বিপুল পরিমাণ শিল্পসম্পদ বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় থাকায় জাতীয় উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না।

শিল্প পুনরুজ্জীবনের কৌশল : বাংলাদেশের বন্ধ শিল্পগুলো আবার চালু করতে হলে খাতভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত সংস্কার প্রয়োজন।

১. শিল্প নিরীক্ষা ও সম্পদ চিহ্নিতকরণ : প্রথম ধাপে একটি জাতীয় শিল্প জরিপ পরিচালনা করা উচিত। এর মাধ্যমে কোন শিল্প সম্পূর্ণ বন্ধ, কোনটি আংশিক সচল এবং কোনটি আধুনিকায়নের মাধ্যমে লাভজনক করা সম্ভব-তা নির্ধারণ করা যাবে।

২. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) : রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলো সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে বেসরকারি খাত, বিদেশি বিনিয়োগকারী বা যৌথ উদ্যোগে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে দক্ষতা বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব কমবে।

৩. প্রযুক্তি আধুনিকায়ন তহবিল : পুরোনো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন ছাড়া কোনো শিল্প পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়। এজন্য স্বল্প সুদের শিল্প আধুনিকায়ন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।

৪. রপ্তানি বহুমুখীকরণ : শুধু ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ওপর নির্ভর না করে মূল্য সংযোজিত পণ্যে যেতে হবে। যেমন, পাটজিওটেক্সটাইল, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং; চিনি শিল্পবায়োফুয়েল ও ইথানল, চামড়াশিল্প ব্র্যান্ডেড ফুটওয়্যার ও ফ্যাশন পণ্য।

৫. দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন : কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার সম্প্রসারণ ছাড়া শিল্প উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব নয়। দক্ষ শ্রমশক্তি শিল্প পুনরুজ্জীবনের মূল ভিত্তি।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা : বিভিন্ন দেশ শিল্প পুনর্গঠনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। ভিয়েতনাম ১৯৮৬ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত অকার্যকর শিল্প পুনর্গঠন করে রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশটির মাথাপিছু আয় কয়েক দশকে কয়েকগুণ বেড়েছে। চীন রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি শিল্প সংস্কার, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ভারত disinvestment নীতি এবং ‘মেইক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিল্প খাতে নতুন গতি এনেছে। ব্রাজিল চিনিশিল্পকে শুধু খাদ্য উৎপাদনে সীমাবদ্ধ না রেখে বায়োইথানল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে রূপান্তর করেছে, যা এখন তাদের শক্তিশালী জ্বালানি অর্থনীতির অংশ।

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব : একটি পর্যায়ক্রমিক শিল্প পুনরুজ্জীবন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে সরাসরি কর্মসংস্থান : ৩-৫ লাখ, পরোক্ষ কর্মসংস্থান : ১০-১৫ লাখ, মোট সম্ভাব্য কর্মসংস্থান : ১৫-২০ লাখ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। একইসঙ্গে বছরে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলারের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব, যা জিডিপিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিল্প সচল হলে করপোরেট ট্যাক্স, ভ্যাট, কাস্টমস ডিউটি, বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি রাজস্ব, রপ্তানি আয়-সব ক্ষেত্রেই রাজস্ব প্রবাহ বাড়বে।

জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি : শিল্প খাত সচল হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, রপ্তানি বাড়ে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়-যার ফলে ভোগ ও উৎপাদন দুটোই বৃদ্ধি পায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জিডিপিতে। ফলে বাংলাদেশ একটি কম উৎপাদনশীল শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে একটি উৎপাদনশীল ও শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।

বাংলাদেশের বন্ধ শিল্পগুলো কোনো ‘মৃত সম্পদ’ নয়; এগুলো আসলে একটি ‘ঘুমন্ত অর্থনৈতিক শক্তি’। সঠিক নীতি সংস্কার, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, পিপিপি মডেল, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এ শিল্পগুলোকে আবার জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি পুরোনো শিল্প পুনরুজ্জীবনই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। কারণ একটি সচল শিল্প শুধু উৎপাদনই বাড়ায় না-এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, রাজস্ব বাড়ায় এবং একটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করে।

কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ (যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি)