ব্যাংকগুলোর বাণিজ্য খাতে নেওয়া ঋণের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বাণিজ্য খাতে নেওয়া ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে খেলাপি হিসাবে। এর বাইরে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে প্রতিবছর দেশ থেকে বিপুল অংকের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার, রাজস্ব আয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বুধবার রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনর অব ব্যাংকস’ শীর্ষক এক কর্মশালায় উপস্থাপন করা এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে তৈরি করেছেন, বিআইবিএম’র অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব, সহকারী অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক রাহাত বানু, প্রভাষক রাজিব কুমার দাস, বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক আরাফাত আলী ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এটিএম নেসারুল হক। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের প্রফেসর ড. মো. আহসান হাবীব। বিআইবিএলের মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি প্রফেসর আলী হোসেন প্রধানীয়া, ইসলামী ব্যাংকের ডিএমডি মাহমুদুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের ডিএমডি সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী, সিটি ব্যাংকের ডিএমডি ফারুক আহমেদ প্রমুখ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই বাণিজ্য খাতে দেওয়া ঋণ। ব্যাংকগুলোর বাণিজ্য খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে এ খাতের মোট ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়েছে। আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি না করা, আইনি দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানের ঘাটতির কারণে এ খাতের ঋণ খেলাপি হচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণের বড় একটি অংশ দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যা ব্যাংক খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
গবেষক ড. আহসান হাবীব বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৮৫৩টি সন্দেহজনক লেনদেনের মধ্যে ৬১৯টিতেই বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ধরনের অর্থ পাচার ব্যাংক খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্যের আদান-প্রদান করা হয় না। এজন্য এ খাতে অর্থ পাচার রোধে সমস্যা হচ্ছে। বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যেই চাপে পড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান কমছে। যেসব ব্যাংকে সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণ বেশি ওইসব ব্যাংকেই বাণিজ্য খাতে ঋণ বেশি রয়েছে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, আমদানির দায় পরিশোধ ও রপ্তানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। বাণিজ্য খাতের ঋণ যাতে খেলাপি না হয়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে এখনই সতর্ক হতে হবে। বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
ব্যাংকাররা বলেন, এলসির বিপরীতে দেওয়া পরোক্ষ ঋণ একটি পর্যায়ে গ্রাহক পরিশোধ করছে না। এখন ব্যাংক ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে গ্রাহকের দায় পরিশোধ করে। ফোর্সড লোনের বড় অংশই খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, তুলাসহ বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল, চিনি, সার, জ্বালানি পুরোনো জাহাজ আমদানিতে ঋণের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে।
বিআইবিএলের মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রম আরও দ্রুত নিরাপদ ও কাগজবিহীন করতে আইনগত ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। নতুন নতুন আর্থিক পণ্য ও ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক হতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগ আরও বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি প্রফেসর আলী হোসেন প্রধানীয়া বলেন, আমদানির এলসি ও রপ্তানি চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যেকার বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত। এ দুটি বিষয় আইন দিয়ে পরিচালিত হতে হবে। তিনি মনে করেন, এলসি খোলা ও রপ্তানি আয় দেশে আনার বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করলে এ খাতের সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হতে পারে।







