সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের জন্য অতিরিক্ত জমি, উন্নত আবাসন, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ব্যবস্থাপনার কথা উঠেছে। মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের এক ব্রিফিংয়ে গত ২০ জুন ২০২৬ এ আহ্বান জানান হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘে বাংলাদেশের একজন স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতের দেয়া তথ্য থেকে বলা হয়েছে,  ‘মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য অতিরিক্ত জমি বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বাংলাদেশ সরকার।’ এ থেকে বাংলাদেশের জনগণের মনে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন জাগছে, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের জন্য জমি বরাদ্দ দিতে বলার হেতু কী? এর মাধ্যমে কি মানবিক সহায়তার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাসের একটি ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে?

রোহিঙ্গা সংকটের শুরু বাংলাদেশে নয়। এর উৎপত্তি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বহীন, অধিকারবঞ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা ২০১৭ সালে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের পর লাখ লাখ সংখ্যায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়। সেই সিদ্ধান্ত বিশ্বের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছিল। কিন্তু প্রশংসার সেই ঢেউয়ের সঙ্গে যে প্রত্যাবাসনের কার্যকর উদ্যোগও আসবে, এমন প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের। ২০১৭ সালে আশ্রয় নেয়া ৪ লক্ষ রোহিঙ্গা ২০২৬ সালে এসে ১২ থেকে ১৩ লক্ষে পরিণত হয়েছে! বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দেওয়া যত দ্রুত সম্ভব হয়েছিল, দিন দিন তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন ততটাই ধীর এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আজ প্রায় এক দশক হতে চলল। রোহিঙ্গারা এখনো কক্সবাজার ও ভাসানচরের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। নতুন প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে, বড় হচ্ছে। অস্থায়ী আশ্রয়স্থল ধীরে ধীরে স্থায়ী বসতির বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে যদি আরও জমি, আরও অবকাঠামো কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনসদৃশ পরিকল্পনার কথা বলা হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এটি কি প্রত্যাবাসনের বিকল্প কোনো চিন্তার ইঙ্গিত?

জাতিসংঘের যুক্তি অবশ্য মানবিক। তারা বলছে, যেহেতু রোহিঙ্গারা এখনো ফেরত যেতে পারছে না, তাই তাদের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশন, নিরাপত্তা, এসব মৌলিক চাহিদা পূরণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার অংশ। এই যুক্তি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি শিশুর শিক্ষা কিংবা একজন বৃদ্ধের চিকিৎসা রাজনৈতিক সমাধানের জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না।

কিন্তু এখানেই মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের জনগণ উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, যত বেশি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো গড়ে উঠবে, তত বেশি স্থায়ী বসবাসের ধারণা শক্তিশালী হবে। একটি শরণার্থী শিবির যখন হাসপাতাল, স্কুল, বাজার, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পেতে শুরু করে, তখন সেটি ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী জনবসতিতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।  তাহলে জাতিসংঘ কি অজান্তেই এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করছে, যেখানে প্রত্যাবাসনের রাজনৈতিক চাপ কমে যাবে?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা নিঃসন্দেহে মিয়ানমার। দেশটির ক্ষমতাসীন শক্তি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। রাখাইনে নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও সম্পত্তির নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো প্রত্যাবাসন টেকসই হতে পারে না। রোহিঙ্গারাও বারবার বলেছে, তারা মর্যাদার সঙ্গে ফিরতে চায়, বন্দিশালার মতো পরিস্থিতিতে নয়।

গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য অসংখ্য বৈঠক, প্রস্তাব, বিবৃতি ও সম্মেলন হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাস্তব ফলাফল প্রায় শূন্য। এ অবস্থায় সমালোচকরা বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি অংশ সংকট সমাধানের চেয়ে সংকট ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে। কারণ সংকট চলমান থাকলে আন্তর্জাতিক প্রকল্প, তহবিল, গবেষণা, কূটনৈতিক আলোচনাও চলমান থাকে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে সরাসরি প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায় না, তবু দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা এমন সন্দেহের জন্ম দেয়।

আমরা চাই রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূখণ্ডে মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তন খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হোক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব সেই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। যদি বিশ্বসংস্থা কেবল শরণার্থী শিবির পরিচালনায় ব্যস্ত থাকে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের রাজনৈতিক শর্ত তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা না রাখে, তাহলে সে কাদের স্বার্থে কাজ করছে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

আসলে জাতিসংঘের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দেরী করছে বা বাধা দিচ্ছে কার স্বার্থে? এই প্রশ্নের উত্তরও খুব সহজ নয়। প্রথমত, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কারণে অনেক শক্তিধর রাষ্ট্র মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মানবিক ইস্যুগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক দরকষাকষির উপাদান হয়ে ওঠে। ফলে বাস্তব সমাধানের চেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই অগ্রাধিকার পায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। জাতিসংঘ কোনো একক নীতিনির্ধারকও নয়। এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে জাতিসংঘের ভেতরে মানবিক সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা এবং রাজনৈতিক অঙ্গগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকতে পারে। মানবিক সংস্থাগুলো মানুষের জীবন রক্ষার কথা ভাববে, আর রাজনৈতিক সমাধানের দায়িত্ব অনেকাংশে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভর করবে। এই বিভাজনের কারণেই অনেক সময় মানবিক সহায়তা এগোয়, কিন্তু রাজনৈতিক সমাধান পিছিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। কক্সবাজার অঞ্চলে পরিবেশগত ক্ষতি, বন উজাড়, স্থানীয় জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। মাদক ও মানবপাচার চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় জনগণ মনে করে, তারা একদিকে মানবিক দায়িত্বের ভার বহন করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান হওয়া উচিত অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশকে বলতে হবে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু সেই সহায়তা কখনোই স্থায়ী পুনর্বাসনের বিকল্প হতে পারে না। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে নয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সব উদ্যোগকে সেই লক্ষ্যকেন্দ্রিক হতে হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আদালত, আঞ্চলিক জোট এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে আরও সক্রিয় হতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবেও তুলে ধরতে হবে। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

জাতিসংঘ যদি সত্যিই রোহিঙ্গাদের কল্যাণ চায়, তবে জমি বরাদ্দ বা অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি তাদের আরও জোরালোভাবে মিয়ানমারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল ক্যাম্প উন্নয়ন নয়, প্রত্যাবাসনের রূপরেখা, সময়সীমা এবং আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি নিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় মানবিক সহায়তা ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী বাস্তবতার ভিত্তি তৈরি করবে, যা বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গা উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

জাতিসংঘ বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের জন্য জমি বরাদ্দ দিতে বলার পেছনে মানবিক যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্যও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ একটি রাষ্ট্রের জন্য মানবিক দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার সার্বভৌম স্বার্থ, সামাজিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের মাটিতে নয়, মিয়ানমারের মাটিতে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো সেই পথকে সুগম করা। যদি বিশ্ব কেবল শরণার্থী শিবিরের পরিধি বাড়ানোর কথা বলে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সাহস না দেখায়, তবে আমরা বলব, রোহিঙ্গা সংকট কি সমাধানের দিকে এগোচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে স্থায়ী করার দিকে? সেই প্রশ্নের উত্তর আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের কাছেই দায় হয়ে রইল।

আমরা চাই রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূখণ্ডে মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তন খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হোক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব সেই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। যদি বিশ্বসংস্থা কেবল শরণার্থী শিবির পরিচালনায় ব্যস্ত থাকে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের রাজনৈতিক শর্ত তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা না রাখে, তাহলে সে কাদের স্বার্থে কাজ করছে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ব্যাপরে রিফুজি সংক্রান্ত গবেষক ও বিশ্লেষকগণও গভীরভাবে ভাবছেন আসলে জাতিসংঘের মাধ্যমে এই স্তুপীকৃত মহাসংকটের সমাধান চাওয়া হচ্ছে, নাকি সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করা হচ্ছে তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক জন্ম দেয়া কারো কাম্য হতে পারে না।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।

[email protected]

এইচআর/জেআইএম