মহিষটি জানত না, সে একটি গর্তের ভেতরে পড়ে যাবে। সে জানত না ৪ ফুট ব্যাসার্ধের গর্তটির গভীরতা প্রায় ৮০ ফুট। মাটি যেন ধসে না পড়ে, সে জন্য গর্তটির চারপাশে বাঁশের চাটাই দেওয়া ছিল, সে কথাইবা কী করে জানবে মহিষটি? জানত না বলেই সে পড়ে গেল গর্তে। এবং এ রকম অপ্রশস্ত গর্তের ৮০ ফুট গভীরে পড়ে গেলে সে কি আর বেঁচে থাকতে পারে? এই মহিষটিও বাঁচেনি।

এটুকু শোনার পর আমাদের মনে হতেই পারে যে একটি মহিষই তো! যাক বাবা, কোনো মানুষ তো নয়। মনে পড়ে যেতে পারে, এ রকমই একটি বোরহোলে পড়ে রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে দুই বছর বয়সী শিশু সাজিদ মারা গিয়েছিল। গত বছর ডিসেম্বরেই ঘটেছিল সেই দুর্ঘটনা। সারা দেশের মানুষ আলোড়িত হয়েছিল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। মনে ছিল আশা, যদি জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা যায় শিশুটিকে! কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন উদ্ধার করেছিলেন সাজিদকে, তখন তার ছোট দেহে প্রাণ ছিল না।

এই ঘটনার পর তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার সব ধরনের বোরহোল বন্ধের নির্দেশ দিয়ে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছিলেন। অনেক বোরহোলই বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু শাহনাপাড়া গ্রামের এই কূপটি বন্ধ করা

হয়নি। ফলে একটি মহিষের মর্মান্তিক মৃত্যু হলো। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের শাহনাপাড়া গ্রামের যে মানুষটির মহিষ এই গর্তে পড়েছিল, তিনি ওঁরাও সম্প্রদায়ের। যাঁর মহিষ, তাঁর নাম বিকাশ খা খা। তিনি দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মহিষ কিনেছিলেন। দুটি মহিষ ছিল তাঁর। একটি আর নেই। ঋণ এখনো শোধ হয়নি। যে মহিষ ছিল সংসার চালানোর ভরসা, সেই মহিষ আর নেই।

যাঁরা গভীর নলকূপ বসানোর নাম করে এই গর্ত খুঁড়েছিলেন, তাঁরা জানতেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের কারণে বিএমডিএ এই অঞ্চলে গভীর নলকূপ স্থাপন না করার ঘোষণা দিয়েছে। তাঁরা ভেবেছিলেন, কোনো এক সময় এখানে গভীর নলকূপ বসাবেন তাঁরা। তাই ঝুঁকি আছে জেনেও তাঁরা গর্তটি বন্ধ করেননি। প্রথম কথা হলো, যাঁরা গর্ত খুঁড়ে এলাকার মানুষ ও পশুর জীবনকে এ রকম ঝুঁকির মুখে রেখেছেন, তাঁদের বিচারের আওতায় আনা দরকার। দ্বিতীয় কথা হলো, কীভাবে বিকাশ খা খা তাঁর এই মহিষের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ পাবেন, সে পথ খুঁজে বের করা।

এমনও হতে পারে, কোনো সুধীজন বিকাশকে হয়তোবা প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়ে মহিষের অভাব পূরণ করবেন। সেটার মধ্যে লোকদেখানো ভালোবাসা হয়তো থাকবে, জনপ্রিয় হওয়ার ‘খায়েশ’ থাকবে, কিন্তু তাতে কি এই ধরনের আত্মঘাতী, নির্মম কাজগুলো বন্ধ হবে? বিকাশ খা খা যদি ক্ষতিপূরণ না পান, কিংবা কেউ যদি তাঁর সাহায্যার্থে এগিয়ে না আসেন, তাহলে তাঁর সংসারটির হাল কী হবে? কারও কাছে কি সে প্রশ্নের উত্তর আছে?