চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে রাজপথের অন্যতম সারথি ছিলেন অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যত্থানের মুখে পতন হয় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। বুধবার (৫ আগস্ট) ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি।
গত দুই বছরে দেশের চিত্রপট অনেক বদলেছে। জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য, বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব বিষয় সামনে এনেছেন মম। ভারতের তেলাপোকাদের আন্দোলনও তুলনামূলকভাবে বর্ণনা করেছেন এই অভিনেত্রী।
চব্বিশের স্মৃতির পাতা উল্টে জাকিয়া বারী মম বলেন, “চোখের সামনে ছাত্র-জনতার মরে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমি ক্ষুব্ধ হয়েছি। এই মৃত্যুটা নিতে পারিনি। স্বাধীন দেশের আন্দোলনে আলোচনা হতে পারে, দফায় দফায় আলোচনা চলতে পারে, কিন্তু কেন এভাবে আমার দেশের মানুষ মরবে! যুদ্ধের মতো মৃত্যু কেন হবে! স্বাধীনতার সময় যে আন্দোলন, সেটা আর এটা তো এক নয়।”
সমকালীন আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে জাকিয়া বারী মম বলেন, “এই ধরনের আন্দোলন তো আমরা পাশাপাশি সময়ে শ্রীলঙ্কা, নেপালেও দেখেছি—মানুষ মরেনি। ভারতেও সাম্প্রতিক সময়ে ককরোচ পার্টি করল—মানুষ তো মরেনি। ভারতে আবার গদিও নড়েনি। ওভাবে মানুষ মারাটা কি আমাদের দেশে দরকার ছিল? মানুষের মৃত্যু নিয়ে এই যে বিতর্ক, কাদা–ছোড়াছুড়ি, অনাস্থা, অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা—এসব তো মোটেও উচিত ছিল না। আমরা যত যা–ই করি না, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুকেই তুলনা করা যায় না। কারণ মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে বলেই আমরা কথা বলতে পারছি। না হলে আমাদের জন্ম পরাধীন দেশে হতো।”
আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যার পাশাপাশি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে জাকিয়া বারী মম বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ, রাজনীতি বুঝি না—ওখানে দাঁড়িয়েছি শুধু ছাত্রদের ওপর গুলি চলছে দেখে। এই গুলি তো অন্য দেশ থেকে এসে কেউ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারি এসে আমাদের দেশে গুলি চালিয়েছে, তারা আমাদের শত্রু, ঠিক আছে! কিন্তু আমারই স্বাধীন দেশে ছাত্র-জনতা আর সরকার কীভাবে একজন আরেকজনের শত্রু হয়! এটা কেন হবে? ওই জায়গায় আমি কথা বলেছি। ওই দিন আমাদের মতো হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যে রাস্তায় নেমেছে—সবাই আশা করেছে, ভালো কিছু হবে।”
সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে জাকিয়া বারী মম বলেন, “অনেক সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু আমরা সেই সম্ভাবনার নেগেটিভ ব্যবহার করেছি, যা আমরা বরাবরই করি। আমাদের একটা সহজাত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নেগেটিভ বিষয়টা ফোকাস হয়ে যায়। সম্ভাবনাটাকে পজিটিভ ব্যবহার করতে পারি না। তাই বলব, যে চাওয়া থেকে আন্দোলনে দাঁড়িয়েছি, পাওয়ার হিসাব মেলেনি। সাধারণ মানুষের আবেগ প্রতারিত হয়েছে, এটা নিয়ে খারাপ লাগা, দুঃখবোধ আছে।”
দেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই প্রতারিত হয়েছেন বলে মত জাকিয়া বারী মমর। ব্যাখ্যা করে এই অভিনেত্রী বলেন, “বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই প্রতারিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ তো রাজনীতি বোঝে না। তারা নিজের কাজটুকু করতে চায় নিষ্ঠার সঙ্গে আর দেশের ভালো হোক, এটাই চায়। সাধারণ মানুষের তো এত টাকা নেই যে, সে ভেগে কোথাও চলে যাবে। আবার এত টাকাও নেই যে, প্রাসাদ বানিয়ে আরাম–আয়েশে দেশে থাকবে।”
খানিকটা ব্যাখ্যা করে জাকিয়া বারী মম বলেন, “সাধারণ মানুষকে দেশের মুমূর্ষু চিকিৎসাব্যবস্থাতেই চিকিৎসা নিতে হয়। দেশে ভেজাল খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সাদামাটা। খামোখা আমরা এটাকে অনেক জটিল করছি। বাংলাদেশের যে জিওপলিটিক্যাল অবস্থা, বিশ্বরাজনীতির যে নিষ্ঠুরতা শুরু হয়েছে—কী আর বলব, বাংলাদেশের জন্য মায়া লাগে।”








