সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশজুড়ে, বিশেষ করে পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং এর ফলে সৃষ্ট পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। দেশের ছয়টি বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা এবং ১২টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, গাছ চাপা এবং পানিতে ডুবে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রাম মহানগরীর ৪২ বছরের ইতিহাসে এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা আর দেখা যায়নি। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে রেললাইন পর্যন্ত ডুবে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা, পরীক্ষা স্থগিত এবং পর্যটন এলাকাগুলোতে যাতায়াত নিষিদ্ধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা একটি ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে আমাদের পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ধস ঘটে। এবারও রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটেছে। পাহাড়ধসের এই পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসনে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। দুর্যোগের মুহূর্তে মাইকিং করে বা সাময়িকভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অন্যদিকে, দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে তিস্তাসহ উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলো বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কায় রয়েছে। ১২টি জেলায় বন্যার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা মোকাবিলায় এখনই মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার এই চরম ভাবাপন্ন রূপ এখন আমাদের নিয়মিত মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে অতিবৃষ্টিতে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপ উন্মোচিত হচ্ছে-যার প্রমাণ চট্টগ্রাম ও বরিশাল নগরী এবং খোদ রাজধানী ঢাকার দীর্ঘস্থায়ী যানজট ও জলাবদ্ধতা; অন্যদিকে নদীভাঙন ও সাগরের উত্তাল রূপ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে। বরগুনার সহস্রাধিক জেলের খালি হাতে উপকূলে ফিরে আসা কিংবা ভোলার তীব্র নদীভাঙন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির এই তাণ্ডবের সামনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কতটা অসহায়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে বিশেষ তৎপরতায় কাজ করতে হবে। প্রথমত, বন্যাকবলিত এবং পানিবন্দি মানুষের কাছে দ্রুত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চাই। দ্বিতীয়ত, পার্বত্য অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসরত মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা এবং পাহাড় কাটার মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তৃতীয়ত, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত সচল করতে হবে, যাতে উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ বিতরণ ব্যাহত না হয়।

প্রকৃতির ওপর মানুষের হাত নেই, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি অবশ্যই সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই দুর্যোগ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে।