বাপ-দাদা, মা ও নিজের নাম সংবলিত মোট ১৬টি ভিন্ন নথির দীর্ঘ তালিকা আদালত ও ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেও নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন আসামের আমিনুল হক। এক যুগান্তকারী রায়ে ভারতের আসামের গুয়াহাটি হাইকোর্ট জানিয়েছেন, আবেদনকারী আমিনুল হক নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আদালতের কাছে ১৬টি ভিন্ন নথি প্রদর্শন করলেও তিনি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারেননি।

বিচারপতি কল্যাণ রায় সুরানা ও বিচারপতি শামীমা জাহানের ডিভিশন বেঞ্চ এই আদেশ পাস করেন। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, আমিনুলের জমা দেওয়া এই ১৬টি নথির কোনোটিই ১৯৬৪ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ধারা ৯ অনুযায়ী- তিনি যে বিদেশি নন বরং একজন ভারতীয় নাগরিক, তা প্রমাণ করতে সাহায্য করছে না। আদালত তার আদেশে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার সম্পূর্ণ দায়ভার সেই ব্যক্তির ওপরেই বর্তায়।

ট্রাইব্যুনালের রায় চ্যালেঞ্জ ও আমিনুলের দাখিলকৃত নথি

এই মামলাটি মূলত আমিনুল হকের দায়ের করা পিটিশনের ভিত্তিতে শুরু হয়। আমিনুল গুয়াহাটির ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেওয়া একটি আদেশকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যে আদেশে আসামের কামরূপের সেই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাকে ‘বিদেশি’ বলে ঘোষণা করেছিল।

নিজের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছে দাবি করে আমিনুল হক আদালতে যে সব গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি জমা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল:

১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (এনআরসি) অনুলিপি, যেখানে তার দাদা-দাদি ও বাবার নাম নথিভুক্ত ছিল।

১৯৬৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভোটার তালিকার সার্টিফাইড বা প্রত্যয়িত কপি, যেখানে তার মা-বাবা ও তার নিজের নাম রয়েছে।

১৯৭৩ সালের জমি ক্রয়ের নথিপত্র।

পার্মানেন্ট অ্যাকাউন্ট নম্বর বা প্যান কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড ও একটি স্কুল সার্টিফিকেট।

উল্লেখ্য, আসামের এনআরসি (Assam NRC) ২০১৯ সালে সম্পন্ন হলেও তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফাইড বা বিজ্ঞাপিত করা হয়নি। মূলত এই নথিটির মাধ্যমেই আসামে কে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক ও কে অবৈধ অভিবাসী, তা নির্ধারণ করার কথা ছিল।

বাবার মৌখিক সাক্ষ্য ও নামের অমিল নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ

শুনানি চলাকালীন আমিনুল হকের বাবা নিজে আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমিনুলকে নিজের ছেলে হিসেবে শনাক্ত করেন। কিন্তু আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, নথিপত্রের উপযুক্ত, গ্রহণযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ ছাড়া কেবল এই ধরণের মৌখিক সাক্ষ্য বাবা-ছেলের মধ্যকার বংশগত বা আইনি সম্পর্ক প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়।

আমিনুল হকের আইনজীবী আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, তার মক্কেল একজন অভিবাসী শ্রমিক ও কিছু নথিতে তার বাবা ও দাদার নামের বানানে অমিল বা অসঙ্গতি থাকার কারণে তাকে বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছে।

এই বিষয়ে আদালতের বেঞ্চ জানায়, এই পর্যায়ে, আবেদনকারীর বাবার যে চারটি ভিন্ন নাম রয়েছে- যেমন মহিরুদ্দিন শেখ, মাহরুদ্দিন শেখ, মহিরুদ্দিন ও মহির উদ্দিন- ভোটার তালিকা তুলনামূলকভাবে পড়ার পর দাদা এবং বাবার নামের বানানের সেই অসঙ্গতিগুলোকে আদালত খুব গুরুত্ব সহকারে দেখছে না। এমনকি, চার নামে পরিচিত এই ব্যক্তির বাবা যে পাসান আলী, আদালত তা আমলে নেওয়ার পরও আবেদনকারী এটি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, এই পরিবারের সব সদস্য- পাসান আলী বা মহিরুদ্দিন বা আবেদনকারী আমিনুল হক- একটানা তিনটি গ্রাম অর্থাৎ দোবাকুড়া, ঘুঘুডোবা ও হাশডোবার সমস্ত ভোটার তালিকায় একসঙ্গে বা ধারাবাহিকভাবে ছিলেন।

আদালত আরও যোগ করেন, মনে হচ্ছে ভোটার তালিকার শূন্যস্থান বা ফাঁকগুলো পূরণ করার জন্য আবেদনকারীর পক্ষ থেকে এই ধরণের আত্মপক্ষ সমর্থনের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কোনো নথির সমর্থন ছাড়াই যুক্তিতে দাবি করা হয়েছে যে, পরিবারটি দোবাকুড়া থেকে ঘুঘুডোবা ও ঘুঘুডোবা থেকে হাশডোবা গ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ভোটার তালিকার নামের সঙ্গে মিল দেখানোর জন্য যুক্তিতে বলা হয়েছে যে, ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার সময় ভুল হয়েছিল।

এছাড়া, আবেদনকারী ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর ‘হাশডোবা আঞ্চলিক উচ্চ বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষকের ইস্যু করা একটি স্কুল সার্টিফিকেট আদালতে দাখিল করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে ওই শিক্ষার্থী ১৯৯৯ সালে স্কুল ত্যাগ করেছেন। তবে আদালত জানিয়েছে, এই সার্টিফিকেটের সপক্ষে বা এটি প্রমাণ করতে ওই প্রধান শিক্ষক আদালতে এসে কোনো সাক্ষ্য বা জবানবন্দি দেননি।

সূত্র: এনডিটিভি

এসএএইচ