আষাঢ় বিদায় নিয়ে শ্রাবণ এসেছে। কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিও হচ্ছে। চলছে ইলিশের ভরা মৌসুম। অথচ এ সময়েও জেলেদের জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। দুই-একটি যা ধরা পড়ছে, তারও দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। গত দুই দিন মেঘনা, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ ও কীর্তনখোলা নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বড় আকারের পাঙাশ। ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীরা এই পাঙাশ দিয়েই বাজারের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন।

গত সোমবার ও গতকাল মঙ্গলবার নগরের পোর্ট রোড মোকামে গিয়ে ইলিশের সরবরাহ খুবই কম দেখা গেছে। যাও আছে তার দাম চড়া। বিভিন্ন জায়গায় ৫ কেজি থেকে শুরু করে ১০ কেজি পর্যন্ত পাঙাশ উঠতে দেখা গেছে। ৫ কেজির একটি পাঙাশ বিক্রেতা রজব আলী কেজিপ্রতি হাঁকালেন ৭৫০ টাকা। পাশের ৭ কেজির একটি পাঙাশ চাইলেন ৯০০ টাকা কেজি।

বিক্রেতারা জানালেন, বর্ষা আর পানি ওঠায় পাঙাশ ধরা পড়া শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ ইলিশ না পেয়ে খুশিমনে পাঙাশ নিচ্ছেন। আবার দুই-তিনজন মিলে ভাগে একটি বড় পাঙাশ কিনে নিচ্ছেন। এমন একজন ক্রেতা মশিউর দিপু জানান, তাঁরা তিনজনে একটি ৭ কেজি ওজনের পাঙাশ কিনেছেন। কেজি নিয়েছে ৮০০ টাকা। দাম চড়া হলেও স্থানীয় নদীর পাঙাশ তাই কিনলেন।

নগরের পোর্ট রোডের আড়তদার নাসির উদ্দিন বলেন, এই বর্ষাতেও মোকামে ইলিশ খুবই কম। তবে বড় পাঙাশ ওঠা শুরু করেছে। প্রতিটি ৬ থেকে ৭ কেজি হতে পারে।

পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকা। দুই দিন ধরে পাঙাশ উঠছে।

ইলিশ সরবরাহের বিষয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী নাসির বলেন, মঙ্গলবার বরিশাল পোর্ট রোড মোকামে ৫০ মণের মতো ইলিশ উঠেছে। ১ কেজি সাইজের ইলিশ ২৮০০ টাকা বিক্রি হয়েছে। একইভাবে এলসি (৮০০-৯০০ গ্রাম) সাইজের ইলিশ কেজিপ্রতি ২৪০০ টাকা এবং হাফ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২০০০ টাকা কেজিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইলিশের সংকট নিয়ে চিন্তিত মৎস্য অধিদপ্তরও। যে কারণে এটি খতিয়ে দেখতে বিভিন্ন স্পটে গবেষণা চালাচ্ছে। জেলেরা বেশ হতাশ ইলিশের দেখা না মেলায়। মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা ঘেরা উলানিয়ার জেলে তোফায়েল হোসেন বলেন, বর্ষা শুরু হয়েছে, নদীতে পানিও আছে। কিন্তু ভরা মৌসুমেও ইলিশ তেমন একটা পাচ্ছেন না। গত এক সপ্তাহে অল্প কিছু ইলিশ পেয়েছেন। এভাবে চললে দাদনের চাপে পিষ্ট হতে হবে।

কালাবদর নদীতে মাছ ধরেন সদর উপজেলার চন্দ্রমোহনের টুমচরের জেলে রিয়াজ হোসেন। তিনি বলেন, কয়েক দিনে দুটি বড় পাঙাশ পেয়েছেন। ইলিশ পেয়েছেন অল্প কিছু। তাঁর মতে, পাঙাশ আরও কিছু পেলে ইলিশের সংকট এই মাছ দিয়ে মেটানো যাবে। কারণ, নদীর এই পাঙাশের চাহিদাও বেশি।

হিজলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, তাঁর আওতাধীন হিজলার মেঘনায় দুই বছর ধরে পাঙাশের পোনা ধরার চাঁই ও সুতার তৈরি নাইলন বড়শি নদী থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তা ছাড়া নজরদারি রাখায় নদীতে পাঙাশের আধিক্য লক্ষ করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, সাধারণত শীতকালে কিছু পাঙাশ পাওয়া গেলেও এবার বর্ষাতেও পাঙাশ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। দুই দিন ধরে জেলেরা নৌকায় করে দুই-তিনটা করে বড় আকারের পাঙাশ ধরে আনছেন। এই অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকলে মেঘনায় দেশীয় মাছের প্রাচুর্য আরও বাড়বে এবং নদীতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ইলিশ নদীতেও পায় না, মানুষ কিনেও খেতে পারছে না। কেন ভরা মৌসুমেও ইলিশ কম তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন বৃষ্টির কারণে কিছু পাঙাশ ধরা পড়ছে। তবে বেশি পাঙাশ ধরা পড়ে নভেম্বরে; শীতের শুরুতে।