বরিশাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক জেলা সমন্বয়ক ও ছাত্রশক্তির সাবেক মহানগর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারজুক আবদুল্লাহসহ একটি গ্রুপ মামলা বাণিজ্যে নেমেছে। হাতবোমা বিস্ফোরণ, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহাসড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ তুলে সরকারি কর্মকর্তাদেরও আওয়ামী লীগ সাজিয়ে মামলা দিচ্ছে তারা। এছাড়া মামলায় কৃষক, বিএনপি নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, বাড়ির কেয়ারটেকারকেও আসামি করা হচ্ছে। মামলার নথি থেকে নাম বাদ দিতে এসব ব্যক্তির কাছে দাবি করা হচ্ছে টাকা। এমনকি মৃত ব্যক্তির নামেও মামলা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী দাবি করে ২৪৮ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন মারজুক। মামলায় ককটেল-হাতবোমা বিস্ফোরণ, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হয়। মামলায় নগরীর পৃথক তিনটি স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের করা অভিযোগ তোলা হয়েছে। এর অংশ হিসাবে নালিশি মামলায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ধরনের মামলা উদ্দেশ্য মূলত আসামিকে চরম দুর্ভোগে ফেলে টাকা আদায়ের ধান্দা।

ভুক্তভোগীদের একজন হলেন গৌরনদীর ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মিশেল আল সাদিক। তিনি ওই মামলার ৯০ নম্বর আসামি। সাদিকের অভিযোগ, ‘বাকেরগঞ্জের কলসকাঠিতে আমার নানার বাড়িতে ৬৬ শতাংশ জমি রয়েছে। জমিটি আমার নানা মৃত আব্দুস সালাম তালুকদারের বাবা মৃত সোবাহান তালুকদারের নামে রেজিস্ট্রি করা আছে। ২০২৫ সাল থেকে একটি পক্ষ ওই জমির ৩৩ শতাংশ ওয়ারিশ সূত্রে নিজেদের বলে দাবি করে আদালতে মামলা করেছেন। এ নিয়ে বিরোধ চলছিল। বরিশাল নগরীর সিএন্ডবি রোডের বাসিন্দা সুলতান খান নামের এক ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করেন। তবে তিনি কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। জমির ধানও কেটে নিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগও দেওয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিষয়টি নিয়ে বাকেরগঞ্জ থানায় বসা হয়। ওইদিন সুলতান, মারজুক ও ববিতাসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তারা থানায় বসেই আমাদের মামলার হুমকি দেয়।’

সাদিক জানান, ‘গত ২৯ জুন রাত পৌনে ৮টার দিকে আমার ফোনে একটি কল আসে। ট্রু কলার সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেখতে পারি মারজুক আব্দুল্লাহ নাম। তবে অপরপ্রান্তের ব্যক্তি আমাকে ‘সাংবাদিক সুমন সরদার’ পরিচয় দেন। ওই ব্যক্তি আমাকে বলেন, আমি নাকি বরিশালের সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ অনুসারী। একটি মামলা হবে, সেখানে আসামি হিসাবে আমার নাম রয়েছে। নাম কাটতে হলে টাকা দেওয়া লাগবে।’

সাদিকের দাবি, ‘মারজুকের মামলায় তার মামা ঢাকার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মাহামুদুল হাসান ৮৯ নম্বর আসামি। যেদিন ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে সেদিন আমার মামা দেশেই ছিলেন না। আমাদের জমির বর্গা চাষি হাবিব মোল্লাকে ৪৫ নম্বর, নাসির হাওলাদারকে ১২১ এবং তার ভাই আমার নানাবাড়ির কেয়ারটেকার রাসেল হাওলাদারকে ২২৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।’

মিশেল আল সাদিকের অভিযোগ, সুলতান খান ও মারজুক আব্দুল্লাহ একটি মামলাবাজ চক্রের নেতা। সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন রয়েছে এই চক্রটির সঙ্গে। এর আগেও মারজুক ও সুলতান পৃথক দুটি মামলা করে বাণিজ্য করেছে।

জানা যায়, সুলতান খান ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় ৩০১ জনকে আসামি করে মামলা করেছিলেন। একই বছরের ১৪ মে ২৪৭ জনের নামে মামলা করেছিলেন মারজুক। এসব মামলায় লোক টার্গেট করে আসামি করা হয় এবং কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করে চক্রটি।

এর আগে ওই চক্রেরই সদস্য মো. জহির গত ১৯ মে বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনায় ১৪২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এই মামলা নিয়েও তৈরি হয় বিতর্ক। এই চক্রটি মোট চারটি মামলা করে বরিশালের সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে।

এসব বিষয়ে অভিযুক্ত মারজুক আব্দুল্লাহর দাবি, ‘আমি কোনো মামলা বাণিজ্য করি না। সত্য ঘটনায় মামলা হয়েছে। আমাকে বিতর্কিত করতে একটা চক্র নানা অভিযোগ তুলতে পারে। তাছাড়া আমাকে ওয়ারেন্টের আসামি বলা হচ্ছে, এটা সত্য নায়।’ অপর অভিযুক্ত সুলতান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বরিশাল মেট্রেপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, মামলায় যেসব ঘটনা ও সময় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো আসলে ঘটেছে কি না-তা তদন্ত করে দেখা হবে।